English Version

আজ ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে আমাদের চিন্তাধারা ও ইতিহাস

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

কে এস এম আরিফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার: বাংলাদেশেও সভা-সমাবেশ ও মিছিল সহ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রমিক মেহনতি মানুষ এই দিনটি উদযাপন করে। তবে এবার করোনা দুর্যোগের কারণে সারা দেশে মে দিবস উদযাপন একটু ভিন্ন আঙ্গিকে হবে। শ্রমিকরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বল্প পরিসরে কারখানার সামনে বা রাস্তার মোরে কিংবা হল রুমে অথবা প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে ১ মিনিট নিরবতা পালন করে ১ মে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত। প্রতি বছর পয়লা মে তারিখে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পয়লা মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ইতিহাস:

১৮৮৬ সালের মে মাসে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস, ন্যায্য মজুরি ও অধিকারের দাবিতে রক্তক্ষয়ী ও আত্মত্যাগী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেদিন শ্রমিক শ্রেণির বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলো। সেই থেকে সারা দুনিয়ায় ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে যথাযথ মর্যাদায় উদযাপিত হয়ে আসছে। এই দিন টি শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক লড়াই সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘণ্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়।

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষ্যে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।

প্রস্তাবে দৈনিক আটঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজন করতে সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না-খাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে ‘বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না-করার’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকর হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবি জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসাবে বেছে নেয়। কোনো কোনো স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে।

পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চিন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মে দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেসব দেশে এমনকি এ উপলক্ষ্যে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে। ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে।

আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদ্যোক্তা। হে মার্কেটের হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যেকোনো আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

মে দিবসের মর্ম বাণী ও উপলদ্ধি:

মে দিবসের ১৩৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এদেশের শ্রমিকরা মে দিবসের সুফল পায়নি। তারা আজও ৮ ঘন্টা কাজ, ন্যয্য মজুরি ও অধিকার বঞ্চিত, শোষিত-নির্যাতিত এবং অগণতান্ত্রিক কালাকানুনের বেড়াজালে আটকা পড়ে রয়েছে। মে দিবসের যে মর্ম বাণী ও চেতনা তা উপলব্ধিতে নিয়ে শোষকদের অন্যায়-অত্যাচার-নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরবে ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম গড়ে তুলার শপথ নিবে। কেননা যে লক্ষ্য নিয়ে মে দিবস ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল তা আজও আমাদের দেশের শ্রমিকরা অর্জন করতে পারেনি।

বাংলদেশ পূর্বে পাকিস্তান সময়ে শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালীরা সংগ্রাম করেছে মুক্তিযুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছে। আর এখন স্বাধীন দেশের মালিকরা স্বাধীন ভাবে এদেশের শ্রমিকদের শোষণ-নির্যাতন করে চলেছে। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে সস্তা শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে তারা দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে অথচ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখেনি। শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মক্ষেত্রে জীবনের নিরাপত্তা, বাসস্থান, রেশন ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ কোন সুযোগ সুবিধা তারা দেয়নি।

কে এস এম আরিফুল ইসলাম
সাংবাদিক, কলামিস্ট সিনিয়র শিক্ষক
দারুল আজহার ইনস্টিটিউট
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।

বিডিটুডেস/এএনবি/ ০১ মে, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

four × four =