English Version

আপনি আধুনিক হিসাব করে যেভাবে স্বর্ণ রৌপ্যের যাকাত দিবেন

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

 

কে এস এম আরিফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার: কুরআন ও হাদীসের অনেক স্থানে ‘যাকাত’-কে ‘ছাদাক্বাহ্’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কুরআন মাজীদের ৮টি মাক্কী ও ২২টি মাদানী সূরার ৩০টি আয়াতে ‘যাকাত’ শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি আয়াতে ‘ছালাত’-এর সাথেই ‘যাকাত’ শব্দ এসেছে।

মহান আল্লাহ তা’আলা সম্পদের অপ্রতুলতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বহু জাতি স্বর্ণ ও রৌপ্য এ দুটি ধাতু দ্বারা মুদ্রা তৈরি করেছে ও দ্রব্যমূল্যের মান হিসাবে গ্রহণ করেছে। আর আমরা জানি যে, স্বর্ণ ও রৌপ্য প্রধানতম সম্পদের অন্তর্ভুক্ত এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। আর এ কারণেই ইসলামী শরীয়াহ স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওপর বিশেষ দৃষ্টি নিবন্ধ করে তার ওপর যাকাত ফরজ করেছে।

যাকাতের আভিধানিক অর্থ: নির্ভরযোগ্য অভিধান খোঁজে আমরা যাকাতের আভিধানিক অর্থ হল এই الطهارة والنماء والبركة والمدح

অর্থাৎ পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ও প্রশংসা উল্লিখিত সব কয়টি অর্থই কুরআন ও হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে।
যাকাতের পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত নিছাব পরিমাণ মালের নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার নাম যাকাত।

কুরআন হাদিসের আলোকে যাকাতের ফজিলত:

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,

“এটা (যাকাত) প্রাপ্য সেসব অভাবগ্রস্ত লোকদের, যারা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত থাকায় জীবীকার জন্যে জমিনে পদচারণা করতে পারে না এবং (আত্মসম্ভ্রমের কারণে) কারো নিকট হাত পাতে না বলে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে।তোমরা তাদের (দারিদ্র্যের) লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের নিকট মিনতি করে যাচনা করে না। আর যে কল্যাণকর কিছু তোমরা ব্যয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা সবশেষ অবহিত। (সূরাহ বাকারাহ ২:২৭৩)

হযরত আবূ হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে ধন-সম্পদ পেয়েছে কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন ওই ধন-সম্পদ এমন বিষধর সাপে পরিণত হবে যার মাথার ওপর থাকবে দুটি কালো দাগ। এ সাপ সে ব্যক্তির গলায় পেচিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সাপ উক্ত ব্যক্তির গলায় ঝুলে তার দুগালে কামড়াতে থাকবে এবং বলবে, আমি তোমার মাল, আমি তোমার সঞ্চিত সম্পদ। (সহীহ আল-বুখারী: ১৪০৩)

হযরত আবূ হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন। আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ্! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন। (সহীহ আল-বুখারী: ১৪৪২, সহীহ মুসলিম: ১০১০)

হাদিসের আলোকে যাকাতের আধুনিক হিসাব অনুযায়ী যেমনটি হবে

স্বর্ণের হিসাবে যাকাতের পরিমাণ:

হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমার কাছে দুইশো দিরহাম থাকলে এবং তা পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে পাঁচ দিরহাম (যাকাত) দিবে। স্বর্ণের ক্ষেত্র বিশ দীনারের কমে যাকাত নেই। বিশ দীনারের পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে অর্ধ দীনার দিতে হবে। এরপর যা বাড়বে তাতে উপরোক্ত হিসাবে যাকাত দিতে হবে। আর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্পদেই যাকাত দিতে হয় না।

উবনু ওয়াহব বলেন, জারীর তার বর্ণনায় বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এক বছর অতিবাহিত না হলে কোনো সম্পদেই যাকাত নেই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫৭৩)

যাকাতের আধুনিক হিসাব:

উল্লেখ্য যে, হাদীসে বর্ণিত ১ দিনার সমান ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ। অতএব, ২০ দিনার সমান ২০×৪.২৫=৮৫ গ্রাম স্বর্ণ। এক ভরি সমান ১১.৬৬ গ্রাম হলে, ৮৫ গ্রাম স্বর্ণে (৮৫÷১১.৬৬)=৭.২৯ ভরি স্বর্ণ। অর্থাৎ কারো কাছে উল্লিখিত পরিমাণ স্বর্ণ এক বছর যাবত থাকলে তার ওপর বর্তমান বাজার মূল্যের হিসাবে মোট সম্পদের ২.৫০% যাকাত দেয়া ফরজ।

যাকাত দেয়ার নিয়ম:

ব্যক্তির মালিকানায় যে ক্যারেটের স্বর্ণ রয়েছে সেই ক্যারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের বাজার দর জানতে হবে। যদি একাধিক ক্যারেটের স্বর্ণ থাকে, তবে অধিক পরিমাণে স্বর্ণ থাকলে প্রত্যেক ক্যারেট স্বর্ণের মূল্য আলাদা করে জানতে হবে; আর পরিমাণ কম হলে যে ক্যারেটের স্বর্ণ বেশি আছে তার বাজার দর জানতে হবে; অতঃপর একগ্রাম স্বর্ণের মূল্যকে তার কাছে যে ক’গ্রাম স্বর্ণ রয়েছে তার সংখ্যা দিয়ে গুন দিতে হবে। এভাবে স্বর্ণের গ্রামকে মুদ্রায় পরিণত করতে হবে, অতঃপর মোট মূল্য থেকে ২.৫% যাকাত হিসেবে বের করতে হবে। এটিই স্বর্ণের যাকাত।

হাদিসে এসেছে:

হযরত আবূ সা’ঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, পাঁচ উকিয়ার কম সম্পদের উপর যাকাত (ফরয) নেই এবং পাঁচটি উটের কমের উপর যাকাত নেই। পাঁচ ওয়াসাক এর কম উৎপন্ন দ্রব্যের উপর যাকাত নেই। (সহিহ আল-বুখারী, হাদিস নং ১৪০৫)

আধুনিক হিসাবে যাকাত:

১ ওয়াসাক সমান ৬০ সা। এ হিসেবে সাহাবীর পাওয়া পাত্রের হিসেবে ১২২ কেজি ৪০০ গ্রাম। আর আরাবী অভিধানের বর্তমানে প্রচলিত হিসেব অনুযায়ী ১৩০ কেজি ৩২০ গ্রাম। (মু’জামু লুগাতুল ফুকাহা পৃষ্ঠা ৪৫০)

রৌপ্যের নিসাব উল্লেখ করে হাদিসে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, পাঁচ ওসাক-এর কম পরিমাণ খেজুরের যাকাত নেই। পাঁচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যের যাকাত নেই এবং পাঁচটির কম উটের যাকাত নেই। (সহিহ আল-বুখারী, হাদিস নং ১৪৫৯)

আধুনিক হিসাব:

উল্লেখ্য, ১ উকিয়া সমান ৪০ দিরহাম, আর ৫ উকিয়া হলো ৪০ ×৫=২০০ দিরহাম। অন্যত্র আরেকটি হাদিসে হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আমি ঘোড়া ও গোলামের যাকাত মাফ করেছি। কিন্তু রৌপ্যের যাকাত প্রতি চল্লিশ দিরহামে এক দিরহাম দিতে হবে এবং একশো নব্বই তোলা পর্যন্ত যাকাত নেই, যখন দুইশো পূর্ণ হবে তখন পাঁচ দিরহাম দিতে হবে।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫৭৪)

দিরহামের আধুনিক হিসাব:

হাদীসে বর্ণিত ২০০ দিরহাম সমান ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য। ১১.৬৬ গ্রাম সমান ১ ভরি হলে ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য হবে ৫৯৫÷১১.৬৬=৫১.০২ ভরি। উক্ত পরিমাণ রৌপ্য কারো কাছে এক বছর যাবত থাকলে তার ওপর বর্তমান বাজার মূল্যের হিসাবে মোট সম্পদের শতকরা ২.৫০ (আড়াই) ভাগ যাকাত আদায় করা ফরজ।

যাকাত দেওয়ার সঠিক নিয়ম:

যে ক্যারেট রৌপ্য তার কাছে রয়েছে, প্রথম তার বাজার দর জানতে হবে। আর যদি একাধিক ক্যারেটের রৌপ্য থাকে, যে ক্যারেট রৌপ্য বেশি রয়েছে তার বাজার দর জানতে হবে। অতঃপর যত গ্রাম রৌপ্য তার মালিকানায় রয়েছে তার সংখ্যা দিয়ে একগ্রাম রৌপ্যের বাজার দরকে গুণ দিতে হবে, মোট মূল্য থেকে ২.৫% যাকাত বের করবেন, যে অংক বের হবে সেটি ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্যের যাকাত।

আরেকটি হাদিসে এসেছে হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবনি ‘উমার রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, যেসব জমিতে বৃষ্টি ও ঝরনার পানিতে সেচ হয়, অথবা যেসব জমিতে উপরিভাগ থেকে সেচ করা হয়, সেসব জমির ফসলে যাকাতের পরিমাণ এক দশমাংশ। আর যেসব জমিতে কূপ থেকে পানি সরবরাহ করা হয়, সেসব জমির ফসলের বিশ ভাগের একাংশ যাকাত (উশর) দিতে হবে।
(সহীহ আল-বুখারী: ১৪৮৩)

লেখক: কে এস এম আরিফুল ইসলাম, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সিনিয়র শিক্ষক, দারুল আজহার ইনস্টিটিউট, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।

বিডিটুডেস/এএনবি/ ২০ মে, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

four × 2 =