English Version

দিনে যাত্রী না ওঠায়, রাতে যাত্রী বহন করে পেটের আহার যোগান প্রতিবন্দী ফারুক

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

জি এম মিঠন, নওগাঁ: সপ্ন ছিলো মাটির ভাঙ্গা ঘড়ের স্থানে একটি ইটের ঘর করবেন। প্রতিবন্দী হওয়ায় দিনের আলোতে তার ভ্যানে কোনো যাত্রী উঠতে চায় না, এজন্য প্রতিবন্দী ফারুক হোসেন সন্ধ্যার পর যখন স্টান্ডের অপর ভ্যান চালকরা চলে যান নিজ নিজ বাসায় বা বাড়িতে, সে সময়ই প্রতিবন্দী ফারুক হোসেন (৩৮) তার ভ্যান নিয়ে হাজির হোন স্টান্ডে।

যাত্রী পাওয়ার আশায় ভ্যানের উপরই বসে থাকেন চাতক পাখির মতো কখন আসবে নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য কোনো যাত্রী। প্রতিটি রাত-ই কাটে এভাবেই। রাতে যাত্রী বহনের হাতে গোনা সামান্য একশত বা দেরশত টাকা রোজগার। সেই সামান্য টাকায় কোনো রকমে চলে তার স্ত্রী সন্তান ৪ জনের সংসার তথা পেটের খাবার।

সামান্য ঐ টাকায় যেখানে ঠিকমত সংসারই চলছেনা, খেয়ে না খেয়ে পার হচ্ছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সেখানে তিনি কিভাবে তার একটি মাত্র আধা-ভাঙ্গা মাটির ঘরের স্থানে ইটের ঘর গড়ে তুলবেন, তবে কি প্রতিবন্দী ফারুকের সপ্ন পূরণ হবে না।

প্রতিবন্দী হওয়ার পরও সে ভিক্ষাবৃত্তিতে না নেমে ব্যাকা হাতেই ধরেছেন ভ্যানের হান্ডেল। নওগাঁয় শারীরিক প্রতিবন্দী ফারুক হোসেনের ব্যাকা হাত ও পায়ে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ভ্যানের চাকা ঘুড়ছে ঠিকই, তবে ঘোড়েনী তার ভ্যাগ্যের চাকা। তবে কি প্রতিবন্দী ফারুকের সপ্ন পূরণ হবে না।

এখানেই শেষ না তার একটি মাত্র আধাভাঙ্গা মাটির ঘর রয়েছে, সেই ঘরেই স্ত্রী আফরোজা বেগম (২৬) ৩য় শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে ফারজানা (১২) ও ৬ বছর বয়সী ছেলে সাহাদৎ হোসেনকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কষ্টের মধ্যে দিয়ে চলছে তাদের জীবন-যাপন, এ যেনো এক করুন জীবন কাহিনী। শারীরিক প্রতিবন্দী ফারুক হোসেন নওগাঁর রানীনগর উপজেলার পশ্চিমবালুভরা গ্রামের মৃত আজিজার রহমানের দ্বিতীয় ছেলে।

১৮ সেপ্টম্বর শুক্রবার রানীনগর উপজেলা সদরে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে উপজেলা সদরে টিটিডিসি মোড়ে সোনালী ব্যাংক শাখার সামনে রাতে খুলে রাখা নারী চা দোকানী আঞ্জুআরা বেগম এর দোকানে চা খেতে গিয়ে রাত প্রায় ১২ টার দিকে দেখা মিলে প্রতিবন্দী ভ্যান চালক ফারুক হোসেনের সাথে।

চা খাওয়ার ফাঁকেই নারী চা দোকানী সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফারুক হোসেনকে ডাকেন এসময় সে যখন তার ভ্যান থেকে নামছিলেন এবং নেমে ব্যাকাপায়ে হেটে আসছিলেন সে দৃশ্য লিখে বুঝানো সম্ভব নয়, তবে তার দুটি হাত ও পা বিকলঙ্গ, অর্থাৎ সে একজন শারিরীক প্রতিবন্দী সেটা আর বুঝতে দেরি হয়নি প্রতিবেদক নওগাঁ জেলা প্রেস ক্লাবের দপ্তর সম্পাদক শহিদুল ইসলাম জি এম মিঠন এর।

এসময়ই প্রতিবন্দী ফারুক হোসেন জানান, তারা মোট ৪ ভাই, এদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় তবে তার অপর ৩ ভাই স্বাভাবিক হলেও তিনি জন্মগতভাবে প্রতিবন্দী। কথার প্রসঙ্গে তিনি কান্নাজড়ীত কন্ঠে তিনি জানান, আমাদের অভাবের সংসার, পিতা মারা গেছেন আরো আগেই, ভাইয়েরাও সবাই বিভিন্নভাবে কষ্টেই মধ্যেই সংসার চালাচ্ছেন।

আর আমি ত প্রতিবন্দী কোনো কাজও করতে পারিনা, ভিক্ষা করাও পাপের কাজ এজন্যই ২০০০ ইং সালের প্রথম দিকে মানুষের কাছে থেকে টাকা নিয়ে সে সময় একটি পায়ে চালিত প্যাডেল ভ্যান ক্রয় করি এবং অনেক কষ্ট করেই ব্যাকা পা নিয়েই ভ্যান চালানো শিখি এবং সে সময়ই সপ্ন ছিলো ভবিষ্যতে এক সময় আমার মাথা গোজার একমাত্র ঘরটি ইটের ঘর করিব জানিয়ে তিনি বলেন, আমি রাতে নয় দিনেই যাত্রী বহনের জন্য ভ্যান কিনেছিলাম কিন্তু সেই শুরুর দিকে আমার ভ্যানে কোনো যাত্রী উঠত না প্রতিবন্দী হওয়ার কারণে, সব যাত্রীই অপর ভ্যানগুলোতে আসা যাওয়া করত, এ কারণেই আমি দিনের বদলে রাতে ভ্যান দিয়ে যাত্রী বহন করা শুরু করি।

এভাবে ৪/৫ বছর ভ্যান চালিয়ে পাওনাদারদের শোধ করার পরই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই জানিয়ে তিনি বলেন, ৪ বছর আগে এনজিও থেকে কিস্তির উপর টাকা নিয়ে সেই টাকায় একটি ব্যাটারী চালিত চার্জার ভ্যান কিনে বর্তমানে সেই ভ্যানে যাত্রীদের বহন করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে আমি ও আমার স্ত্রী আফরোজা বেগম, মেয়ে ফারজানা ও ছেলে সাহাদৎ কোনো রকমে দিন পার করছি।

হাত-পা ব্যাকা হওয়ার কারণে ভ্যান চালাতে অনেক কষ্ট হয় জানিয়ে তিনি বলেন, আমার ভ্যানের চাকা না ঘুড়লে আমি সহ আমার স্ত্রী ও সন্তানদের পেটে (ভাত) খাদ্য জুটবেনা। আমার ভ্যানের চাকা ঘুড়লে প্রতি রাতে কোনদিন ১শত বা সর্বোচ্ছ দেরশত টাকা যেটাই পাই সেই টাকায় পরের দিন বাজার করে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আমরা স্বামী স্ত্রী কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে জীবন-যাপন করছি।

এছাড়াও জায়গাঁ-জমি না থাকায় একটি মাত্র আধাভাঙ্গা মাটির ঘড়েই এক প্রকার (ঘাদাঘাদি) অবস্থার মধ্যেই আমাদের বসবাস। অবশেষে প্রতিবন্দী ফারুক হোসেন বলেন যদি সরকারী বা বেসরকারীভাবে আমার থাকার একটি মাত্র মাটির ঘড়ের স্থানে ইটের একটি ঘড় নির্মাণ করে দিতো তাহলে আমার সপ্নটা পূরণ হতো। বিডিটুডেস/এএনবি/ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

4 × 1 =