English Version

দুটি শিশু রক্ষা পেল, রক্ষা পেল না দুই পরিবার

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

তারিকুল ইসলাম চৌধুরী, দিনাজপুর: দিনাজপুরে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী সাজুর সন্ত্রাসী বাহিনীর তান্ডব ও সামুরাই মহড়া উপভোগ করেছে পুলিশ। সন্ত্রাসীদের দেয়া আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ভষ্ম হওয়া থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে অবুঝ দুটি শিশু। তাদের আগুন সন্ত্রাসে পুড়ে ভষ্মিভূত হয়েছে নিরীহ একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন। আর আরেকটি পরিবারের সম্পূর্ণ পুঁজিটুকু লুট করে নিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে তার দোকান।

সর্বস্ব হারিয়ে পরিবার দুটি নিঃস্ব হলেও কি এক অদৃশ্য কারণে পুলিশ এখন পর্যন্ত নিরব ভূমিকা পালন করছে। ইয়াসমিন আন্দোলনের এই দিনাজপুরের মাটিতে পুলিশের এহেন ন্যাক্কারজনক ভূমিকা সত্যিই বিষ্ময়কর। বিষয়টি উর্দ্ধতন মহল আশু হস্তক্ষেপ না করলে যে কোনো সময় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে এলাকাবাসী আশংকা প্রকাশ করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঈদের দিন দিনাজপুর সদর উপজেলার উত্তর শেখপুরা এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী সাজু গং দেশীয় অস্ত্রের তান্ডব ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এতে ২টি পরিবার পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেছে। পেট্রোলের আগুনে মামুন হোসেন সুজনের সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অল্পের জন্যে রক্ষা পেয়েছে ৬ বছরের শিশু কন্যা বর্ষা ও ২ বছরের পুত্র স্বপ্ন। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিলো ঘরের আশপাশে।

এ সময় স্বপ্ন ও বর্ষাকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসেন জনৈক প্রতিবেশী নাজির। তবে পৃথক ঘটনায় সন্ত্রাসীদের কবল থেকে রক্ষা পায়নি ৮০ বছরের অন্ধ বৃদ্ধ মোঃ সমসের আলী ও ৬০ বছরের বৃদ্ধা জোৎস্না বেগম। একই সন্ত্রাসী দলের পৃথক দুটি ঘটনা হার মানিয়েছে মানবতাকে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে ৪ জন। এই ভয়াবহ সন্ত্রাসের ঘটনা দুটি ঘটে ঈদের দিন রাত অনুমান সাড়ে ৮ টায় ও পরের দিন সকাল ১১টায়।

মাদক ব্যবসায়ীর ছিটিয়ে দেয়া পেট্রোলের আগুনের লেলিহান শিখায় সর্বস্ব হারিয়ে সুজনের পরিবারের আহাজারিতে আকাশ বাতাস স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সন্ত্রাসীরা প্রায় ১ ঘণ্টা যাবত তান্ডব চালায়। আগুনের লেলিহান শিখা যখন সুজনের স্বপ্নকে ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীরা তখন দেশীও অস্ত্রের মুখে তার স্ত্রী পুত্র কন্যাদের আগুনে নিক্ষেপ করে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিছুক্ষণ পর দিনাজপুর ফায়ার সার্ভিসের দু’টি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

নিঃস্ব সুজনের পরিবারকে কাপড়-চোপড় ও খাদ্য সরবরাহ করছে পাড়া প্রতিবেশীরা। দুটি ঘটনায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ টাকা। ভুক্তভোগী পরিবারের কর্তা মোঃ মামুন হোসেন সুজন জানান, মাদক ব্যবসায়ী মো: সাজু (২৬) কয়েকদিন আগে আমার বাড়ীর সামনে মাদক বিক্রি করতে আসায় আমি তাতে বাঁধা দেই।

উক্ত ঘটনার জের ধরে ঈদের দিন রাত অনুমান সাড়ে ৮টায় মো: সাজুর নেতৃত্বে প্রায় অর্ধ শতাধিক সন্ত্রাসী সামুরাই, রামদা, হাসুয়া, চাইনিজ কুড়াল, পেট্রোল ও জ্বালানি জাতীয় তরল পদার্থ ও দিয়াশালাই নিয়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করে। সন্ত্রাসীরা প্রতিটি ঘরে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ক্ষণিকের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখায় ঘরের স্টীল আলমারী, কাপড়, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, দলিলপত্র, আইডি কার্ড, ড্রেসিং টেবিল, সোফাসেটসহ আসবাবপত্র গ্যাসের চুলা, ফ্রিজসহ সর্বস্ব পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

এতেও সন্ত্রাসীরা ক্ষান্ত হয়নি। আমার নিষ্পাপ শিশু-পুত্র কন্যাকে আগুনে নিক্ষেপের চেষ্টা করে। এছাড়াও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমার স্ত্রীকে অমানবিক নির্যাতন করে। সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাড়ির প্রধান গেট রান্না ঘর, খড়ির ঘর, স্টোর রুম, বাউন্ডারির ওয়াল ভাংচুর করে। প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের শক্তির মহড়া দাপট ও ত্রাসের রাজত্বে এলাকাবাসী ভীত হয়ে পড়ে। সুজন জানায়, এ ঘটনায় ২৯ জনকে আসামী করে কোতয়ালী থানায় এজাহার দেয়া হয়েছে।

একই দিন রাত ৮টায় সন্ত্রাসীরা সুজনের বাড়িতে আগুন দেয়ার পূর্বে সেকেন্দার আলীর হোটেলে ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। সেকেন্দার আলী ও তার পুত্র বিজয়কে এলোপাথাড়ি মারপিট করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা ক্যাশ থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা ও ৩০ হাজার টাকার সিগারেট নিয়ে যায়। যাওয়ার পথে আনোয়ার নামে একজনের ইজিবাইক ভাংচুর করে।

পরের দিন সন্ত্রাসীরা ঐ হোটেলের মালিক সেকেন্দারের ৮০ বছরের বৃদ্ধ পিতা সমসের আলী ও ৬০ বছরের বৃদ্ধ মাতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে বেদম প্রহার করে ও হত্যার চেষ্টা চালায়। এ ঘটনায় ৪ জন আহত হয়। এ ঘটনায় সেকেন্দারের পুত্র বিজয় ৬ জনের নাম উল্লেখ করে ৭/৮ জনের বিরুদ্ধে কোতয়ালী থানায় এজাহার দাখিল করে।

কোতয়ালী থানার ওসি তদন্ত বজলুর রশীদ অভিযোগ দুটি পেয়েছেন এবং ঘটনার পর পরেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছায় বলে জানান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোনো আসামী গ্রেফতার হয়নি। তবে এখানে বিষ্ময়কর ঘটনা হলো-দীর্ঘ ৪ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোতয়ালী থানায় দুটি মামলায় রেকর্ড করা হয়নি। কি অদৃশ্য কারণে মামলা রেকর্ড হচ্ছে না তা জানা যায়নি। তবে বিষয়টি ধীরে ধীরে নেতিবাচক দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এলাকাবাসী বলছেন- দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। আর এর জন্য সকল দায়-দায়িত্ব প্রশাসনকেই নিতে হবে।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির অন্যতম সদস্য ও জেলা জজ কোর্টের অতিরিক্ত পিপি হাজী সাইফুল ইসলাম জানান, সন্ত্রাসীদের এ তান্ডব মেনে নেয়া যায়না। একটি পরিবারকে পেট্রোলের আগুন দিয়ে নিঃস্ব করে দেয়া হয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞ কাকে বলে এ ঘটনা দেখলেই বোঝা যাবে।

তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা যখন আগুন দেয় তখন ঘরের মধ্যে শিশু বর্ষা ও স্বপ্ন ছিলো। প্রতিবেশী নাজির তাদের বের না করলে ঘটনা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতো। এখন দেশে আইন রয়েছে। আমি পুলিশ প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি-অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনুন। বিডিটুডেস/এএনবি/ ০৫ আগস্ট, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

5 × 4 =