English Version

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ চাই

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

সাইদুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী ধর্ষণের মধ্য দিয়ে ধর্ষণকারীরা ফিতা কাটলো নতুন বছরের। ধর্ষণের প্রতিবাদে আজ ঢাবি উত্তাল, কাল রাজপথ উত্তাল, পরশু সারা দেশ উত্তাল হবে, সমস্ত মিডিয়া, পত্রিকা উত্তালের সাগরে ভাসতেছে। এরপর কিছু আশ্বাসের বাণী নিয়ে ঘরে ফিরবে সবাই, পত্রপত্রিকার কোথাও হয়তোবা স্থান পাবে না এই ধর্ষণের খবর। সমাজের মানুষের নৈতিক অধঃপতন যদি এভাবে অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে সমাজে ইজ্জত-সম্মান অথবা সামাজিক নিরাপত্তা সবই অসম্মানের দুর্গন্ধে সমাজ, সংসার ঢেকে যাবে। নিরবে নিবৃত্তে আত্মচিৎকার করবে সমাজের লাজ্জিত মানুষগুলো।

যুগের তালে সমাজের অবক্ষয় অথবা সমাজের মানুষরূপী জানোয়ারদের অপকর্মের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভিন্নতা আসছে ধর্ষণেও। ধর্ষণের ব্যাপকতা বা নতুন মাত্রা দিচ্ছে ধর্ষণকারী। ধর্ষণকারীরা এ সমাজ সংসারের অশুভ শক্তি। ধর্ষণের নিষ্ঠুরতাই আজ সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে স্থান পাচ্ছে। বৃদ্ধা অথবা চকলেট খাওয়া শিশু থেকে শুরু করে পাঁচ সন্তানের জননীও ধর্ষণকারী নামক সমাজের কীটগুলোর বিকৃত যৌন হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। অথচ সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীদের অবদান প্রশংসনীয়। অগ্রগতিতে তাদের অবদান বড় ভূমিকা রাখলেও ঘরের মধ্যে নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি।

ধর্ষণের দৌরাত্ম্যের দাবানলে বাংলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লা আজ কম্পিত। মনে হচ্ছে সবুজ, শ্যামল, স্বাধীন দেশটা দিনে দিনে ধর্ষণকারীদের দাপটে অদৃশ্য হয়ে যাবে সমাজের মূল্যবোধ। পত্রিকা, মিডিয়া, কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ধর্ষণের প্রতিদিনের খবরে নতুনত্ব পরিলক্ষিত হয়। যারা অতি উৎসাহী হয়ে ধর্ষিতার ছবিসহ খবর প্রকাশ করেন, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ “ধর্ষিতা নয়, ধর্ষকের ছবি প্রকাশে উৎসাহিত হই।”

মসজিদ, কওমি মাদ্রাসার কিছু আলেম নামের কলঙ্ক, তাদের অভিনব ফান্দে পরে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে আসা মেয়েরা। এই আলেম নামক জালেমদের হাত থেকে মেয়ে অথবা ছেলে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। মেয়েরা হচ্ছে ধর্ষিতা আর ছেলেরা হচ্ছে বলৎকার। এইসব জালেম আলেমদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজের মুখ খোলা উচিৎ। সমাজ ধর্মীয় শিক্ষকদের কাছ থেকে ধর্ষণের মতো অধর্মীয় কাজ কোনোদিন জাতি প্রত্যাশা করেনি। আবার গতানুগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও ধর্ষণে পিছিয়ে নেই। শিক্ষাকে যারা ধর্ষণের টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তাদের বিচার রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরে এসে করতে হবে। প্রতিটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বাক্স রাখতে হবে।

বেজাতদের (ধর্ষণকারী) আচরণে জাতি আজ হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে। প্রশাসন বা রাষ্ট্র যদি মনে করে, “বেজাতরা” ভিন্ন গ্রহ থেকে গ্রহান্নিত হয়েছে। এটা হবে জাতির জন্য হতাশা ব্যঞ্জক। বেজাতরা যুগে যুগে ছিল। হয়তো বা তাদের দেহ থেকে এখন অতি বেগুনী রশ্মি নিঃসরণ হচ্ছে বেশী। এই নিঃসরণে নারীকুল মাঠে, ময়দানে, বাসে, ট্রাকে, ট্রেনে এমনকি মসজিদ, মাদ্রাসায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অথবা সিঁধকেটে কিংবা ঘরের দরজা ভেঙ্গে গণধর্ষণ মহাসমারোহে চলতেছে। বেজাতরা নিজের মেয়েকে পর্যন্ত ধর্ষণ করতে বিবেকে বাঁধেনা। বেজাতদেরকে আমরা পুরুষজাত থেকে ধিক্কারের সাথে বিতাড়িত করে দিতে চাই। বেজাতরা পুরুষ স্বরূপে দৃশ্যমান হতে পারবে না। কারণ তাদের বক্ষ বিদীর্ণ করে “বেজাত” চিহ্ন এঁকে দিব। এই বেজাতদের কোনো দল, ধর্ম, বর্ণ, জাত, গোষ্ঠী মা, বোন নেই। সবাই আজ এদের কন্ঠনালি ছিন্ন করে, কন্ঠরোধ করতে বদ্ধ পরিকর।

ধর্ষকের বিকৃত যৌন আচরনে আমাদের নারী সমাজ আজ আতংকিত। ওরা সমাজের মারাত্মক ব্যধি। ওদের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ওদের অশুভ লম্বা অংশটুকু কুকুরের খাবারে শুভা পায়। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ শুধু রাষ্ট্রীয়। ধর্ষণের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে রাষ্ট্রকে বের হয়ে আসতে হবে। আইন থাকলে কি হবে? যদি আইনের সঠিক প্রযোগ না থাকে। ধর্ষণের জন্য আইন এখন অনেক শক্তিশালী কিন্তু বিচারহীনতার জালে আবদ্ধ আইনের ধারা। তাই শুধু আইন দিয়ে সমাজকে ধর্ষণ মুক্ত করা সম্ভব নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষের সাহায্য ও সহযোগিতা একান্ত দরকার। পাশাপাশি সামাজিক বিচার সালিশে ন্যায় বিচার অতন্ত জরুরী।

ধর্ষণ রোধে আইনের সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি চাই জড়ালো সামাজিক আন্দোলন। বর্তমানে সারা দেশে ২০ হাজারেরও বেশী ধর্ষণের মামলা বিচারাধীন। এই সব মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। ধর্ষণকারীকে মানসিকভাবে চাপে রাখার জন্য সমাজচ্যুত করা অতি জরুরী। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করে, ধর্ষণ প্রতিরোধ কমিটি করতে হবে। ধর্ষণকারির পরকালে কি রকম শাস্তি হতে পারে, তার বর্ননা মসজিদ, মন্দির, গির্জায় দিতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী একজন ধর্ষকের কি বিচার হতে পারে, তা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করাতে হবে। বিদেশী সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো প্রকার অশ্লীল ছবি প্রদর্শন যাতে করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ধর্ষণের রাষ্ট্রীয় আইনের যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে।

ধর্ষণের বিচারের চেয়ে ধর্ষণ প্রতিরোধ অতি জরুরী। প্রকাশিত ধর্ষিতাকে সমাজ কলঙ্কের দায়মুক্তি সহজে দেয় না। পরবর্তী প্রজন্মান্তরও এর দায়ভার এড়াতে পারেনা। ধর্ষণের পর ধর্ষিতা ও ধর্ষিতার পরিবারের সামাজিক অবস্থা মাটিতে মিশে যায়। সমাজের কেউ তাদেরকে প্রকাশ্যে ঘৃণার বৃদ্ধা আঙ্গুলী দেখায়, কেউ আবার ধর্ষিতার পরিবারেকে সমাজচ্যুত করার জন্য চক্রান্তের জাল বিস্তার করে। ধর্ষিতা ও ধর্ষিতার পরিবারকে যুগের পর যুগ ধরে ধর্ষণের অপবাদ সইতে হয়। ধর্ষকের হয়তোবা রাষ্ট্রের আইনানুযায়ী সর্বোচ্চ বিচার হবে কিন্তু তার পরিবার কিংবা পরবর্তী প্রজন্মকে এ দায়ভার বহন করতে হবে না।

প্রকাশিতব্য ধর্ষণের চেয়ে অপ্রকাশিতব্য ধর্ষণ অনেক বেশী। পুরুষ কর্তৃক অপ্রকাশিত ধর্ষণের শিকার দেশের ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ নারী। এটা রাষ্ট্র কিংবা সমাজ অস্বীকার করতে পারবেনা। সমাজ, সংসার ও লোক লজ্জার ভয়ে বেশী সংখ্যক নারীরাই, নারীকুলের সর্বস্ব হারানোর কথা স্বীকার করেনা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে কেবল ১ দশমিক ১ শতাংশ পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। যারা অভিযোগ করেন, তাদের মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী নিজের পক্ষে বিচার পান। বাকি ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ অভিযোগ আদালতে খারিজ হয়ে যায়; অনেক ক্ষেত্রে শুনানিও করা হয় না।

ধর্ষণের মতো এত বড় মানসিক চাপ সব নারী নিতে পারেনা। যারা চাপ সইতে পারেনা তারা কেউ আত্বহত্যার মতো জঘন্যতম কাজটা করে, কেউ আবার পাগলের খাতায় নাম লেখায়। অবশিষ্টরা জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকে। তাই পরিসংখ্যান এখানে কতটুকু সত্যতা দিতে পাবরে, তা পরিস্কার। তারপরও গত বছরের চেয়ে এ বছর ধর্ষণের সংখ্যা অনেক বেশী। যার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে ১৪১৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছিল। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল ৭৬ জনকে আর ধর্ষণের গ্লানি বইতে না পেরে আত্বহত্যা করেছিল ১০ জন। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের শিকার হয় ২৫৮ জন নারী। আবার যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হন ১৭ জন। এ বছর আশঙ্কাজনক হারে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছর (২০১৮) ৭৩২ জনরেও বেশী নারী ধর্ষিত হয়েছিল। আর ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল ৯৬ জন।

ধর্ষণের নির্মম যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্বহত্যা করেছে ৩ জন। ২০১৯ সালে গড়ে প্রতি মাসে ১১৭ জনের বেশী নারী ধর্ষিত হয়েছে। বর্তমানে ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা অপ্রত্যাশীতভাবে বেড়ে গেছে। এর জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন করে ভাবতে হবে। নারীদের প্রতি আমার আবেদন, “আপনারা পোশাকে আধুনিক না হয়ে, মনে এবং মানসিকতায় আধুনিক হবেন “। সাইদুর রহমান, লেখক ও কলামিস্ট, বিডিটুডেস/এএনবি/ ১১ জানুয়ারি, ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

3 × 2 =