English Version

নওগাঁয় ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ মহামারি আকার ধারণ করেছে

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

জি, এম মিঠন, নওগাঁ: নওগাঁয় গবাদি পশুর ভাইরাস জনিত চর্মরোগ’ ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ এর প্রাদুর্ভাব ব্যপকহারে দেখা দেওয়ায় চরম আতঙ্কিত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার ১১টি উপজেলার প্রায় সব খামারি সহ ও গবাদি পশু লালন-পালনকারিরা। এ ব্যাধিটি যদিও বা জেলার রানীনগর উপজেলার গ্রাম গুলোতে প্রথমদিকে দেখা দিয়েছিলো। কিন্তু ইতিমধ্যেই চর্মরোগ ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ নামের এ ব্যাধিটি ছড়িয়ে পড়েছে নওগাঁ জেলা জুড়ে।

তবে বর্তমানে জেলার মহাদেবপুর ও সাপাহার উপজেলার প্রায় সব কয়টি ইউনিয়নের গ্রাম পর্যায়ে বড়ি বাড়ি (গৃহ-পলিত গবাদি পশু বিশেষ করে গরু ও মহিষ এর উপর) ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পরেছে চর্মরোগ’ ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’। গরু খামারিরা বলছেন, এ রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন বাজারে পাওয়ার কারণেই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা দিনদিন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি হয়েই চলেছে।

তবে শঙ্কিত না হয়ে খামারিসহ যেসব ব্যাক্তিবর্গ বা কৃষক পরিবাররা নিজ নিজ গৃহে গবাদী পশু পালন করছেন তাদেরকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রাণী সম্পাদ বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চৌমাশিয়া গ্রামের আঃ মজিদ মন্ডল, আঃ সামাদ মন্ডল সহ আরো কয়েকজন সাধারন কৃষকরা জানান, আমরা কৃষকরা কৃষি ফসল চষের পাশাপাশি আমাদের প্রতিটি কৃষকদের বাড়িতেই কমবেশী গৃহপালিত গবাদীপশু গরু-ছাগল লালন-পালন করি, জানিয়ে তারা আরো বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকার ন্যায় বেশ কয়েকদিন ধরে আমাদের গ্রামে ও গবাদি পশুর ভাইরাস জনিত চর্মরোগ’ ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ মারান্তকভাবে আক্রমন করছে।

আমরা পশু চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি বলে তারা আরো বলেন, যে গরু এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সেটি সারতে অনেক সময় নিচ্ছে এত করে আমাদের অনেক অর্থ পশু চিকিৎসকের পেছনে খরচ হচ্ছে বলেও তাদের অভিযোগ। জেলার কয়েকটি খামারি সহ গ্রামে গরু পালনকারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে গরুর চামড়ার উপরিভাগের অংশে টিউমার জাতীয় উপসর্গ ও বসন্তের মতো গুটি গুটি দেখা যাচ্ছে।

এরপর দু-একদিনের মধ্যেই গরুর সারা শরীর জুড়ে অসংখ্য গুটি গুটি হয়ে ঘা-সৃষ্টি এমন কি মারান্তক ক্ষতের সৃষ্টি হওয়া সহ সেই ক্ষতে পোকা ও জন্ম নেয়ার ঘটনা ও ঘটছে ফলে আক্রান্ত পশুকে নিয়ে লালন-পালনকারী সহ খামারীরা দিশেহারা অবস্থার মধ্যেদিয়ে দিন পার করছেন। এ রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে ১০৪ থেকে ১০৬ ডিগ্রী তাপমাত্রায় জ্বর ও লক্ষ করা যাচ্ছে, যার ফলে আক্রান্ত গরু খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। অনেক সময় গরুর বুকের নিচে বা পেটের উপরিভাগে পানি জমে ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে এবং ক্ষতস্থান থেকে মাংস খুলে-খুলে পড়ছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানায়, ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগটি প্রথম ১৯২৯ সালে জাম্বিয়াতে দেখা দেয়। পরে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বত্রে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে এবং ২০১৪-২০১৫ সালে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, কাজাকিস্থানসহ আশেপাশের দেশসমূহে এ রোগ দেখা দেয়। ২০১৬ সালে গ্রীস, সাইপ্রাস, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, কসোভোসহ আশেপাশের দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়ে রোগটি। ২০১৯ সালে চীন ও ভারতে আক্রান্তের পরই বাংলাদেশে এ রোগটি অতি সম্প্রতি প্রথম বারের মতো দেখা দিয়েছে।

এব্যাপারে পশুসম্পদ ভেটেনারী সার্জন বলেছেন, এ রোগ সাধারণত মশা, মাছি, আটালি, আক্রান্ত পশুর লালা, নাক-চোখের ডিসচার্জ, ষাড়ের বীর্য, আক্রান্ত গরু-মহিষের দুধ এবং বহুবার ব্যবহারিত ইনজেকশনের সিরিঞ্জের মধ্যমে ছড়ায় বেশি বলেই ধারনা করা হচ্ছে। অনুকূল পরিবেশে কোনো কোনো এলাকায় এ ভাইরাজ ছয় মাস পর্যন্ত জীবিতি থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন এসময়। ভাইরাস জনিত এ চর্মরোগে শুধুমাত্র গরু-মহিষ আক্রান্ত হয়ে থাকে। ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগে আক্রান্ত গবাদিপশু অত্যান্ত দুর্বল হয়ে ওজন কমে যায়, দুধ উৎপাদন ক্ষমতা অনেকাংশে হ্রাস পায় এবং চামড়ার গুণগতমান নষ্ট হয়ে যায়।

এ বিষয়ে সাপাহার উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা (ভারপ্রাপ্ত) ভেটেনারী সার্জন ডা.আশীষ কুমার দেবনাথ বলেন, সাপাহার উপজেলার প্রায় সবকটি ইউনিয়নেই এই রোগ ছড়িয়ে গেছে এবং ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজে’ এ পর্যন্ত প্রায় ১শ’ থেকে দেড়শ গরু আক্রান্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে কোথাও কোন গরু মারা যাওয়ার খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলেও দৈনিক-জাগো জনতাকে জানিয়েছেন তিনি।

অপরদিকে জেলা পানি সম্পদ বিভাগের ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা এবিষয়ে আরো কয়েক দিন পূর্বে থেকেই লোকজনকে সচেতন করতে গ্রামে গ্রামে সচেতনতা মুলক লিফলেট বিতরণ করা সহ বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত গবাদি পশুকে ফ্রিতে চিকিৎসা ও দিয়েছেন। এব্যাপারে ভয়ের কিছু নেই কিছু দিনের মধ্যেই রোগটি ভালো হয়ে যাবে এবং ইতোমধ্যে চিকিৎসা দেয়া অনেক গরুই ভাল হয়ে গেছে বলেও পানি সম্পদ অধিদপ্তর এর কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য- এ রোগটি ইতি মধ্যেই গোটা জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পরলেও নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চৌমাশিয়া গ্রামে ও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এ গ্রামের গরু লালন-পালনকারীদের অভিযোগ তারা এখন পর্যন্ত হাজার হাজার টাকা খরচ করে তাদের গরুকে স্থানিয় পশু চিকিৎসকের মাধ্যমেই চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসলেও সরকারীভাবে বা পানি সম্পদ বিভাগ এব্যাপারে তাদের কোন সহযোগীতা করেনি। বিডিটুডেস/এএনবি/ ১৪ নভেম্বর, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

20 − 9 =