English Version

নওগাঁয় হঠাৎ করেই ধানের বাজারে নেমে এসেছে ধস !

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

জি, এম মিঠন, নওগাঁ: নওগাঁর হাট-বাজারগুলোতে হঠাৎ করেই কৃষকের মাথার-ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো সোনালী ফসল ধানের বাজারে নেমে এসেছে ধস, কৃষকরা হয়ে পড়েছেন দিশেহারা। মাত্র এক সপ্তাহর ব্যবধানেই নওগাঁর বিভিন্ন হাট-বাজারে মোটা-চিকন সব রকম ধানের মূল্য প্রতি মনে কমেছে ১শত টাকা থেকে ১শত ৮০ টাকা পর্যন্ত। হঠাৎ করেই ধানের মূল্য কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই সাধারণ কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অথচ চলতি আমন মৌসুমের ধান-কাটা ও মাড়াইয়ের শুরুতেও বাজারে প্রতিমন ধান যে মূল্যে কেনাবেচা হয়েছিলো তাতে করেও জেলার কৃষকরা তেমন লাভের মুখ না দেখলেও বিগত বছর গুলোর ন্যায় লোকসানে মুখে পড়তো না বলেই সে সময় জানিয়েছিলেন কৃষকরা।

(১ডিসেম্বর) রবিবার নওগাঁর এতিহ্যবাহী হাটচকগৌরী ধানহাটিতে ধান বিক্রি করতে আসা মহাদেবপুর উপজেলার শাহ আলম, সাজ্জাত হোসেন মন্ডল ও নজরুল ইসলাম সহ আরো ১০/১৫ জন কৃষকের সাথে সরাসরি কথা বলাহলে এসময় আক্ষেপ প্রকাশ করে কৃষকরা বলেন, প্রথমদিকে ১৫/২০ দিন পূর্বে ও আমরা যে দামে প্রতি মন ধান বিক্রি করেছি তাতে লাভের পরিমাণ বেশী না হলেও বিগত বছরের ন্যায় এবার লোকসানের মুখে পড়তে হবেনা বলেই ভেবেছিলাম আমরা। কিন্তু মাত্র এক হাটের ব্যবধানেই আজ প্রতিমন ধান ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হলাম আমরা।

এসময় তাদের ভেতর বর্গাচাষী দুজন কৃষক জানান, আমাদের নিজস্ব জমি না থাকায় গ্রামের গেরস্তর কাছে থেকে প্রতি বিঘা জমি অর্ধেক ধান দেয়ার শর্তে বর্গানিয়ে ধান চাষ করেছি, কিন্তু বিগত ইরিবোরো মৌসুমের ন্যায় চলতি আমন মৌসুমে ও আমাদের ব্যাপক লোকসানের মূখে পড়তে হলো। আর আমি বা আমাদের মত গরীব বর্গাচাষি কৃষকরা আগামীতে ধান চাষ করতে পারবেনা। আর ধান চাষ না করে গেরস্তর বাড়িতে দিনমজুরী কাজ করলেও অনেক বেশি আয় হতো জানিয়ে তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতেই নওগাঁর বিভিন্ন হাট-বাজার গুলোতে বিশেষ করে স্বর্ণা-৫, জাতের ধান প্রতি মন সারে ৭ শত থেকে ৮ শত টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছিল। এখন সেই স্বর্ণা-৫, জাতের ধান জেলার প্রায় প্রতিটি হাট-বাজারে প্রকার ভেদে ৬শত থেকে সারে ৬ শত টাকা প্রতি মন কেনাবেচা চলছে। শুধু স্বর্ণা-৫, জাতের ধানের মূল্য কমেনি একই সাথে মোটা-চিকন সর্ব জাতের ধান ই প্রতি মনে ১শত টাকা থেকে ১৪০/১৮০ টাকা পর্যন্ত কমে কেনাবেচা হচ্ছে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার সহ ধানের আড়ৎ গুলোতে।

এ ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধানকালে একজন ধানের আড়ৎদার ও তিন জন ধান-চাতাল ব্যবসায়ীদের বক্তব্য নেয়া হলে, তারা প্রথমেই নিজেদের নাম বা প্রতিষ্ঠানের নাম না প্রচারের শর্তদিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, সম্প্রতি গত কয়েকদিন পূর্বে বাজারে মোটা-চিকন প্রতি কেজি চালের মূল্য প্রকার ভেদে ১ থেকে ২/৩ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই প্রশাসন চাল ব্যাবসায়ীদের উপর নজরদারী শুরু করেছে বা শুরু করবে এমন আভাস পাওয়ার পরই মূলত জেলার বড় বড় ধান ব্যবসায়ী বা আড়ৎদার সহ এমনকি অটো রাইচ মিল মালিকেরাও ধান কিনে মজুদ করতে ভঁয় পাচ্ছেন, কারণ যেকোনো সময় প্রশাসন অভিযানে নামলে এবং গোডাইনে যদি ধানের মজুদ দেখে হয়রানী করেন এমন ভঁয়েই অনেক বড় ধান ব্যবসায়ী আড়ৎদার ও অটো রাইচ মিল মালিকরা ধান কিনে মজুদ না করার কারণে এবং পাশাপাশি সাধারণ কৃষকরাও তাদের জমিতে ফলানো ধান কাটা ও মাড়াই করেই বিশেষ করে কিটনাশকের ও সারের মূল্য পাওনাদারকে পরিশোধ করার জন্য এসময় প্রচুর পরিমাণ ধান হাট-বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন।

একারণেই মূলত বর্তমান জেলার প্রতিটি হাট-বাজার গুলোতেই হঠাৎ করেই ধানের বাজারে ধস নেমে এসেছে। এক কথায় বাজারে প্রতি কেজি চালে ১ থেকে ৩ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে প্রশাসন যে কোনো সময় অভিযানে নামতে পারে এমন ভয়ে জেলার বড় আড়ৎদার বা অটো রাইচ মিল ব্যবসায়ীরা পূর্বের ন্যায় ধান কিনে মজুদ না করে অল্পকিনে ব্যবসা চালানোর কারনেই ধানের বাজারে তুলনামূলক ক্রেতার অভাব সৃষ্টি হওয়ার কারনে ধানের বাজারে ধস নেমে এসেছে বলেই প্রাপ্ত তথ্য জানাগেছে। মূলত নওগাঁ জেলার বিভিন্ন এলাকার আড়ৎদাররা ধান কিনে মজুদ করার পরই সেই ধান নওগাঁ সহ দেশের বিভিন্ন জেলার (ধান-চাতাল) মিলারদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু জেলার বড় আড়ৎদার ও অটো মিলাররা ধানকিনে মজুদ না করার কারনেই হঠাৎ করেই জেলার ধানের বাজারে ধস নেমে এসেছে।

অপরদিকে হঠাৎ করেই ধানের বাজারে ধস নেমে আসার কারণে কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এমনকি ধানচাষী কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবেদককে বলেছেন, বাজারে পেঁয়াজের প্রতি কেজি মূল্য আমরা কৃষকরা পেয়েছিলাম মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা। যখন আমরা (কৃষকরা) পেঁয়াজ বিক্রি করে সংসারের খরচ ও ঋণ শোধ করলাম এরপরই সেই পেঁয়াজ ই এখন লাফিয়ে লাফিয়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা। তারপরও প্রশাসনের চোঁখ বন্ধ, তারা এখন পর্যন্ত পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

অথচ বাজারে প্রতি কেজি চালে ১ টাকা বা ২/৩ টাকা বাড়তে কি না বাড়তেই প্রশাসন নাকি মাঠে নামছে যাতে কেউ ধান বেশী কিনে মজুদ করতে না পারে। এসময়ই কৃষকরা আরো বলেন, বাজারে চালের মূল্য প্রতি কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে একই সাথে ধানের মূল্য ও বাড়ানো দরকার, এতে করে দেশের কৃষককূল টিকে থাকতে পারবে, নাহলে আগামীতে কৃষকরা নিস্ব হয়ে পরবে। কৃষকদের ধান চাষের খরচ বিবেচনা করে হলেও বাজারে সর্বনিম্ন প্রতিমন মোটা জাতের ধান যেন সাড়ে ৮ শত থেকে সারে ৯ শত টাকার নিচে কেনাবেচা করতে কৃষকদের না হয় সে বিষয়ে ও প্রশাসনের আশু দৃষ্টি কামনা করেছেন জেলার কৃষকরা। বিডিটুডেস/এএনবি/ ০২ ডিসেম্বর, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

two × 5 =