English Version

পবিত্র ‘জুমাতুল বিদা’ বা ‘আল- কুদস’ দিবস এর গুরুত্ব, তাৎপর্য, মাহাত্ম্য ও উদ্দীপ্ত অনুভূতি

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

কে এস এম আরিফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার: আজকের দিনেই বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর প্রায় ২শ’ কোটি মুসলমান এ দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উদযাপন করে থাকেন। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ভরদুপুরে দেশের আড়াই লাখের বেশি মসজিদে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে জীবনের সার্থকতা কামনা করেন। কারণ আজ পবিত্র ‘জুমাতুল বিদা’ বা ‘আল- কুদস’ দিবস। কী এই ‘জুমাতুল বিদা’ বা ‘আল- কুদস’ দিবস: পবিত্র মাহে রমজানের শেষ জুমার দিন মুসলিম বিশ্বে ‘জুমাতুল বিদা’ বা এদিন রমজান মাসের শেষ জুমা হিসেবে ‘আল-কুদস দিবস’ নামেও পরিচিত। তাই পবিত্র রমজান মাসের শেষ জুমা হওয়ায় এর গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। জুমাতুল বিদাকে আরও মহিমান্বিত করেছে, রমজানের শেষ শুক্রবারকে আল কুদস দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা। কারণ প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবারে বিশ্বের মুসলমানরা ইসরাইলের কবল থেকে মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মোকাদ্দাসকে মুক্ত করার জন্য নতুন শপথ নিয়ে থাকেন। এজন্য রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে আল কুদস দিবসও বলা হয়।

ঐতিহাসিকদের প্রসিদ্ধ মতে আল্লাহর নবী হযরত দাউদ (আ.) এর পুত্র হযরত সোলায়মান (আ.) জেরুজালেম নগর প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লাহর মহিমা তুলে ধরতে তিনি সেখানে মুসলমানদের প্রথম কেবলা মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন। মক্কার মসজিদে হারাম ও মদিনার মসজিদে নববীর পর মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হচ্ছে বায়তুল মোকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসা। আর সেই বায়তুল মোকাদ্দাস দীর্ঘ দিন ধরে ইহুদিরাষ্ট্র ইসরাইলের কাছে অবরুদ্ধ আছে। আজকের জুমা শেষে বিশ্বের মুসলমানরা বায়তুল মোকাদ্দাসের মুক্তির জন্যও আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাত করবেন।

সাধারণ হিসাবে একটি রমজানে সাধারণত ৪ থেকে ৫টি জুমা পাওয়া যায়। আর শেষ জুমাটিকে মনে করা হয় রমজানের বিদায়ী ঘোষণা। তাই বলা হয় এটিকে জুমাতুল বিদা। এ জুমায় থাকে মুমিনেরা ঈমান আমলের মওসুম ও রহমত মাগফিরাতের সুসময় চলে যাওয়ার বেদনা। থাকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের প্রার্থনা, আবেগ ও উদ্দীপ্ত অনুভূতি। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ভরদুপুরে দেশের আড়াই লাখের বেশি মসজিদে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে জীবনের সার্থকতা কামনা করেন।

হেলথ টিপস পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

পৃথিবীর প্রায় ২শ’ কোটি মুসলমান এ দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উদযাপন করে থাকেন। রোজা অবস্থায় জুমার নামাজে সমবেত হয়ে মহান আল্লাহর গুণগানের পাশাপাশি শেষ নবী হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরম প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সালাম পেশ করবেন। জুমার পূর্বে মসজিদের খতিবের মুখে দীনি আলোচনা শুনে, দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজসহ বহু নফল নামাজ পড়ে, দান-খয়রাত ও দোয়া-মোনাজাত করে দিনটিকে বিদায়া জানাবেন। জুমাতুল বিদার তাৎপর্য, গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য এখানেই নিহিত।

আর সাপ্তাহিক জুমার নামাজ মুসলমানদের বৃহত্তর জামাতে অনুষ্ঠিত হয়। রমজান মাসের জুমাবার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতময়। জুমাতুল বিদাসহ মাহে রমজানের প্রত্যেক জুমাবারে ইবাদত-বন্দেগিতে অধিক সওয়াব লাভের সুযোগ থাকে। সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমান মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর শেষ শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করে মাহে রমজানকে বিদায় সম্ভাষণ জানান। তাই পবিত্র কোরআনে জুমার নামাজ জামাতে আদায়ের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর।’ (সূরা আল-জুমুআ, আয়াত-৯)

বিশিষ্ট ইসলামি স্কলারদের মতে, অন্যান্য দিনের চেয়ে শুক্রবার তথা জুমার দিনে মর্যাদা অন্য দিনের তুলনায় বেশি। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে পবিত্র রমজান মাস। তাই আজকের জুমার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই এদিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।

‘জুমাতুল বিদা’ বা ‘আল- কুদস’ দিবসের তাৎপর্য : জুমার নামাজ অপরিহার্যভাবে জামাতের সঙ্গে আদায় করা আবশ্যক বিধায় একাকী পড়ার বিধান নেই। রমজান মাসের সর্বোত্তম দিবস হলো জুমাতুল বিদা, যা মাহে রমজানে পরিসমাপ্তিসূচক শেষ শুক্রবারে পালিত হয়। এদিন মুমিন মুসলমানদের ইমানি সম্মিলন হয়। এদিনে এমন একটি সময় আছে যে সময় মুমিন বান্দার মোনাজাত ও ইবাদত আল্লাহ বিশেষভাবে কবুল করেন। এ সময়টি হলো দ্বিতীয় খুতবার আজানের সময় থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে জুমাবার সর্বাধিক মর্যাদাবান ও নেতৃত্বস্থানীয় দিন। এ পুণ্য দিনে আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। এদিন তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন। এদিন তিনি পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করেন। এদিন তাঁর ইন্তেকাল হয়। এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ পুণ্য দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যে সময় আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হয়।’ (মিশকাত)

মাহে রমজানের বিদায়ী শুক্রবার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অতি মূল্যবান। এদিন সিয়াম শেষ হয়ে যাওয়ার সতর্কতামূলক দিবস। জুমাতুল বিদা স্মরণ করিয়ে দেয় যে রোজার শেষ প্রান্তে এর চেয়ে ভালো দিবস আর পাওয়া যাবে না। রোজার শুরু থেকে যেসব ইবাদত ব্যস্ততাবশত ফেলে রাখা হয়েছে, যে গুনাহখাতা মাফের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে ভুল হয়েছে, জুমাতুল বিদার দিনে দোয়া কবুল হওয়ার সময়ে এর বরকত হাসিল করা বাঞ্ছনীয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলমান রমজান মাস পেল, কিন্তু সারা বছরের গুনাহখাতা মাফ করিয়ে নিতে পারল না, তার মতো হতভাগা আর নেই।’ যে তিনটি বিষয় জুমাতুল বিদাকে আল্লাহর করুণা, দয়া, ক্ষমা তথা মাগফিরাত ও নাজাত লাভের দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তা হচ্ছে মাহে রমজান, জুমাতুল বিদা এবং শেষ শুক্রবার ‘আল-কুদস দিবস’।

এই গুরুত্বের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কোটি কোটি মুসল্লি আবেগভরা উপস্থিতিতে ভরে তুলবেন লাখো মসজিদ। নানা বয়সি মুসল্লিদের উপচে ওঠা ভিড় মসজিদ নেমে চলে আসবে মসজিদ প্রাঙ্গণে, পার্শ্ববর্তী চত্বর, ফুটপাত রাজপথ ও খোলামাঠে। দেখা যাবে আল্লাহর রহমত কামনায় মশগুল কাতারবন্দি শুভ্র-সফেদ লাখো মানুষের ইবাদতের এক অনুপম দৃশ্য। রাজধানীর কর্মজীবী মানুষ বিপণিকেন্দ্র, বাজার, আড়ত, রাস্তায় জায়নামাজ, কাগজ, কার্টনের শিট, সংবাদপত্র ইত্যাদি বিছিয়ে নামাজে শরিক হচ্ছে মানুষ। কোনো বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা নেই। আছে শুধু আকুলতা, মুক্তি কামনা ও রহমত র্প্রাথনা। তরুণ, যুবক, শিশু-কিশোর, বয়স্ক-প্রবীণ সবাই একাকার হয়ে যাবেন আজকের জুমায়।সবার একটাই চাওয়া, আল্লাহর রহমত।

‘জুমাতুল বিদা’ বা ‘আল- কুদস’ দিবসের মাহাত্ম্য ও উদ্দীপ্ত অনুভূতি: জুমাতুল বিদার বিশেষ তাৎপর্য এই যে রমজান মাসের শেষ শুক্রবার আল্লাহর নবী হজরত দাউদ (আ.)-এর পুত্র মহামতি হজরত সুলায়মান (আ.) জেরুজালেম নগর প্রতিষ্ঠা করেন এবং আল্লাহর মহিমা তুলে ধরতে সেখানে পুনর্নির্মাণ করে গড়ে তোলেন মুসলমানদের প্রথম কিবলা ‘মসজিদ আল-আকসা’। মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববির পর তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হচ্ছে ‘বায়তুল মোকাদ্দাস’ বা ‘মসজিদ আল-আকসা’। রাসুলুল্লাহ (সা.) যে তিনটি মসজিদের উদ্দেশে সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, এর অন্যতম হচ্ছে ‘বায়তুল মোকাদ্দাস’। ইসলামের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

মসজিদ আল-আকসা এবং তার আশপাশের এলাকা বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত। এ মসজিদকে কেন্দ্র করে অসংখ্য নবী-রাসুলের দাওয়াতি মিশন পরিচালিত হয়েছে। এটি সব মুসলমানের ইমান ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসুলের মাজার। ওহি ও ইসলামের অবতরণস্থল, আম্বিয়া কিরামের দ্বীন প্রচারের কেন্দ্রভূমি, তাই এ পবিত্র নগরের প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক মুমিনের হূদয়ের গভীরে প্রোথিত। মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকে মুসলমানদের দ্বারা বায়তুল মোকাদ্দাস পবিত্র স্থান রূপে গণ্য হতে থাকে। কোরআন শরিফে বায়তুল মোকাদ্দাসকে পবিত্র ভূমি উল্লেখ করা হয়েছে, ‘(স্মরণ করো, মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল) হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন, এতে তোমরা প্রবেশ করো এবং পশ্চাদপসরণ করো না, করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২১)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজের নৈশভ্রমণের প্রথম পর্ব সংঘটিত হয়েছিল মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্ব ছিল মসজিদুল আকসা থেকে ঊর্ধ্বলোক। মিরাজে এ মসজিদেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সমস্ত নবী-রাসুলের ইমামতি করেছিলেন। এ পরিভ্রমণে বায়তুল মোকাদ্দাসকে মাধ্যম রূপে মর্যাদা প্রদানের পেছনে এর পবিত্রতার স্বাক্ষর বহন করে। পবিত্র কোরআনে এ ভূখণ্ডের পবিত্রতা বা বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রজনীতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় পরিভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চতুষ্পার্শ্ব আমি বরকতময় করেছিলাম তাঁকে আমার নিদর্শন পরিদর্শন করার জন্য, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ১)

প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমান বায়তুল মোকাদ্দাসে ইহুদিদের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের কবল থেকে পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মুক্ত করার জন্য নতুন শপথ গ্রহণ করে থাকেন। তাই মাহে রমজানের ‘জুমাতুল বিদা’ তথা শেষ শুক্রবারকে ‘আল-কুদস দিবস’ বলা হয়। রোজার সমাপনীসূচক জুমাতুল বিদার নামাজে মসজিদে বিশেষ মুনাজাতে রোজাদার মুসল্লিরা দেশ-জাতির উন্নয়ন, আল-কুদসের মুক্তি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, শান্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আর এমন আবেগ, অনুভব মূলত আল্লাহর কাছে রহমত, মাগফিরাত, নাজাত, দীন-দুনিয়ার মঙ্গল, মানবজাতির শান্তির জন্য। সবকিছুই রাব্বে করীম কবুল করেন। আমিন

লেখক:
ক্বারী মাওলানা শেখ মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম
সাংবাদিক ও সিনিয়র সহকারী শিক্ষক
দারুল আজহার ইনস্টিটিউট
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।

বিডিটুডেস/আরএ/৩১ মে, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

four + three =