English Version

পুলিশ বাবা’র মেয়ের জন্মদিনের আবেগময় স্ট্যাটাস

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

শেখ আমিনুর হোসেন, সাতক্ষীরা: র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের পরিচালক (ট্রেনিং) চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির তার ফেসবুক ওয়ালে মেয়ের জন্মদিনের আবেগময় স্ট্যাটাস দেশের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল “bdtodays.com” পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:

আমার বড় মেয়ে Celia Monzur Raj Chowdhury এর জন্মদিন মানেই বলা নাই, কওয়া নাই, কোত্থেকে দাপ্তরিক কাজ এসে জুটবে আমার ঘাড়ে, তা ভাবনারও অতীত। গতকাল ছিলো সিলিয়া’র জন্মদিন। কিন্তু মনে হচ্ছিল সব অতীত অভিজ্ঞতা মিথ্যে প্রমাণিত করে এবার বোধহয় আমার বড় মেয়ের জন্মদিনে ওর বাবার সরব উপস্থিতি ও প্রথমবারের মতো উপভোগ করতে চলছে। তাই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ও জিজ্ঞেস করেছিলো, বাবা,’ ঘুম থেকে উঠে তুমি কি আমাকে ‘হ্যাপী বার্থডে’ বলবে?’ আমিও অনেকটা নিশ্চিন্তে আস্থার সাথে বলেছিলাম, ‘ইনশাআল্লাহ, নিশ্চয়ই বলবো।’ কিন্তু বলতে পারিনি, আমার বড় মেয়ের জন্মদিন তার ঐতিহ্য খোয়াতে রাজী নয়। মেয়েদেরকে ঘুমন্ত রেখেই পূর্ণ পোষাকে আমাকে বাসা থেকে বের হতে হয়েছে। আর ফিরেছি ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১২ টা ছুই ছুই করছে তখন। জন্মদিনে বাবাকে সে এবারও মিস করেছে।

পরশু হোটেল সোনারগাঁও থেকে দাপ্তরিক অনুষ্ঠান শেষে রাত প্রায় ১২ টার দিকে বাসায় পদার্পণের ক্ষণকাল পরেই রাত পোহালে কুমিল্লা গমনের আদেশ প্রাপ্ত হই। সারাদেশের এতো জায়গা থাকতে ‘কুমিল্লা’ গমনের কারণ শ্রদ্ধাভাজন নেটিজেনকূল নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছেন। অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখা ভালো যে, ‘কঞ্জিউমারিজম’ থেকে উদ্ভুত এইসব সংস্কৃতির (আমার দৃষ্টিতে অপসংস্কৃতি) প্রতি আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই, আছে বুক জুড়ে ঘৃণার পাহাড়। কিন্তু দুর্বল আমি উজান স্রোতে চলতে পারি না বিধায়, স্রোতের অনুকূলে গা অনেকটা এলিয়ে দিয়েছি।

২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর। আমি সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার। যশোরে জরুরী মিটিং। আমার বড় মেয়ের জন্মদিনে আমি বাসায় অনুপস্থিত। ২০১৬ সালের ১১ অক্টোবর। আমি রংপুরের Additional DIG। ঢাকায় মিটিংয়ে। মেয়েরা রংপুরে। মিটিং শেষ করে পড়িমরি করে মধ্যরাতে রংপুরে হাজির। মেয়ে আমার জন্মদিনে মিস করলো তার বাবাকে। ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর। আমি রংপুরের Additional DIG। আমার বড় মেয়ের জন্মদিন পালনের সব আয়োজন শেষ। আমরা জন্মদিনসহ যেকোনো উৎসব পালনের একটা নিজস্ব রেওয়াজ অনুসরণ করে থাকি।

সাহেব- সোহেবদের পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিহিত, আমাদের সাধারণ খাবার-দাবারের প্রতি অনাসক্ত, মোবাইল ফোনের রশ্মিতে চোখের দৃষ্টি আংশিক খুইয়ে চশমা দিয়ে নাক-কান জড়িয়ে ধরা- জাতির এরকম একঝাঁক ভবিষ্যৎই শুধুমাত্র আমাদের পরিবারের বাচ্চাদের জন্মদিন পালনের অংশীদার হয় না। বরং যেকোনো উৎসব-পার্বণ আমরা সুবিধা-বঞ্চিত কিছু মানুষের সাথে ভাগাভাগি করি। শুধু তাই নয়। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর কিছু সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বাসায় এসে হাজির হয়। আমরা আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে তাদেরকে একবেলা পেটপুরে খাওয়ানোর চেষ্টা করি। এরা যাতে মৌসুমী ঐতিহ্য অনুযায়ী খাবার-দাবার-ফল-ফলাদির স্বাদ পায়, তাই যে মৌসুমের যা ঐতিহ্য, সেই মৌসুমে তাই দিয়েই তাদেরকে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করে থাকি।

স্বাস্থ্যের খবর জানুন

এই ধারাটা যুগাধিককাল আগে আমার একমাত্র বোন ব্যারিস্টার মৌসুমী কবিতা চালু করছিলো, যা আমার স্ত্রী Chowdhury Nurjahan Monzur এসেও অব্যাহত রেখেছে। যাইহোক, খাবার-দাবার-কেক নিয়ে আমরা পূর্বনির্ধারিত এতিম খানার উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছি। এমন সময় ঠাকুরগাঁও গমনের আদেশ নাযিল হলো। সেখানে অগ্নিকান্ডে এক পরিবারের ৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যে অবস্থায় ছিলাম, সেই অবস্থায়ই দে ছুট। মেয়ের জন্মদিন পালন তো আর মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না। একবারও মনে হলো না, আজই কেনো এমন দূর্ঘটনা ঘটতে হবে। আদ্যোপান্ত পুলিশ তো! নিজের আনন্দের থেকে অন্যের প্রয়োজনে কিছু করতে পারার আকুতিটাই বেশী প্রাধান্য পায়।

২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর। আমার RAB-4, ঢাকায় পোস্টিং। মেয়েরা থাকে রংপুরে। এবার অবশ্য দায় আমার না। এবার মেয়ের স্কুলে পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ করে রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে বাবার কাছে আসতে আসতে রাত। ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর। মানে, গতকাল। শুরু করেছিলাম তো গতকালের ইতিহাস দিয়েই। গতকাল যে কুমিল্লায় গিয়েছিলাম, তা মনে আছে তো?

সারাদিন কুমিল্লায় ব্যস্ত সময় পার করে, সেখান থেকে ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম রাত নয়টায়। এতো ব্যস্ততার মাঝেও মাতৃভান্ডারের রসমালাই সাথে আনতে ভুল হয়নি। এর মধ্যে বাবা ছাড়াই মেয়ের জন্মদিন উদযাপন চলছে। দুপুরে যথারীতি সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের সাথে কেক কেটে তাদেরকে আপ্যায়ন। তাদের আপ্যায়নের জন্য আগেরদিন ছোটোখাটো একটা খাসি কিনে আনা হয়েছিলো। তারা আমার স্থায়ী মেহমান। তাদের আপ্যায়নে খাসি না মারলে কি চলে?

এর আগে মেয়ের মামা নৌবাহিনীর কমান্ডার Tofael Ahmed কেকসহ বাসায় এসে কোরবাণী’র ঈদের দিনের হুজুরদের মতো তড়িঘড়ি করে কেক কেটে ফুরুত। নৌবাহিনীতে ইতিহাস গড়া কর্মকর্তা তো। তাই একটু বেশীই ব্যস্ত। ইতিহাস গড়া বললাম এই কারণে যে, দেশের প্রথম সাবমেরিন চায়না থেকে দেশে আনার সময় উনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। আগের রাতেই অবশ্য বাসায় জামশেদের (মেয়েদের বড়ভাই তুল্য পুলিশ সদস্য) নেতৃত্বে আওসাফুর (পুলিশ সদস্য), রুবেল (পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও আশরাফ (রন্ধন শিল্পী) একটা কেক এনে কেটে-কুটে জন্মদিন উদযাপন উদ্বোধন সম্পন্ন করেছে।

মেয়ের ‘সদা ব্যস্ত’ একমাত্র ফুফু তার নতুন কেনা গাড়ীর যত্ন নিতে যেয়ে, নিজের একটা পা’ই মচকে ফেলেছে। তাই তার পক্ষ থেকে এই প্রথমবারের মতো কোনো উপহার সামগ্রীর অনুপস্থিতি গোচরীভূত হয়েছে। উপহার পাঠাতে না পারলেও, জন্মদিন পালনের খরচ-পাতি বাবদ একটা স্বাস্থ্যকর পরিমাণ অর্থ তিনদিন আগেই পাঠাতে ভুল করেনি, যার ‘উদ্বৃত্ত’ আমার পকেটস্থ হয়েছে। আর মেয়ের ছোটো কাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক Himel Chowdhury আগাগোড়াই সবার জন্মদিন ভুলে যেয়ে থাকে। এবার কেনো ব্যতিক্রম হবে? তার স্ত্রী Shahnaj Akhter অবশ্য গিফট পাঠাতে কখনোই ভুল করে না। তবে এবার PhD ডিগ্রী অর্জনের উদ্দেশ্যে, ওরা সবাই ক্যামব্রিজ অবস্থান করায়, এখানেও উপহারের বন্ধাত্ব পরিলক্ষিত হয়েছে।

রাতে বাসায় এসেছিলেন মিজোরামের IPS অফিসার DIG নিচুংগুয়ানা, শিলং এর অত্যন্ত দাপুটে নারী পুলিশ সুপার মিসেস ক্লডিয়া এবং অন্যান্য কয়েকজন অতিথি। তারা অবশ্য জন্মদিনের অতিথি হিসেবে আসেননি। তবু তাদেরকে পেয়ে আমার মেয়ের জন্মদিনের আনন্দ অনেকগুন বেড়ে গিয়েছে। এতোক্ষন যেসব আয়োজনের কথা বললাম, তার সবটাই হয়েছে আমার অনুপস্থিতিতে, যা আমার স্ত্রী’র কাছ থেকে শুনেছি। আর শোনা কথায় কান দিতে নাই। তাই প্রমাণস্বরূপ তিনি কিছু ছবিও আমার কাছে পেশ করেছেন। ছবিগুলো আমিও আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে রাত প্রায় বারোটা বাজে বাজে। কিন্তু সারাদিনের হাড়ভাংগা খাটুনিতে আমার বারোটা পূরোই বেজে গিয়েছে। আমার বারোটা বাজলেও, ঘড়িতে বারোটা না বাজার সুযোগ কাজে লাগালাম। দৌড়ে ঘরে ঢুকে পোষাক চেঞ্জ না করেই, আগে মেয়ে’কে কেক খাইয়ে দিলাম আর মেয়ে ‘হ্যাপী বার্থডে’ বললাম। ঘুম ভেংগেই যে কথা বলার কথা ছিলো, সেকথা বললাম পরদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে। কারণটা জানতে চান? আচ্ছা বলছি। কারণ, আমিতো মানুষ নই, পুলিশ। আগেতো পুলিশ, পরে তো বাবা। বিডিটুডেস/এএনবি/ ১২ অক্টোবর, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

eighteen + 18 =