English Version

ফল ফুল সব্জী বাগান আর গানের মধ্যে দিয়ে সুনামগঞ্জ মডেল থানাকে আলোকিত করছেন ওসি সহিদুর রহমান

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ: মৎস্য বালিপাথর ধান হাওড় আর গানের জনপদের নাম সুনামগঞ্জ। যে সুনামগঞ্জকে বলা হয় পঞ্চরত্ন বাউলের দেশ। যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত, মরমী কবি হাছনরাজা, গানের সম্রাট বাউল কামাল পাশা, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম ও জ্ঞানের সাগর দূর্বিণ শাহ।

পঞ্চরত্নের এই জনপদে চাকরী করতে এসে যিনি নিজেও সংগীতপ্রেমী হয়ে গান রচনায় ইতোমধ্যে সুনাম অর্জন করেছেন তিনি হচ্ছেন গীতিকার মুহাম্মদ সহিদুর রহমান। শুধু গান রচনাই নয় ফুল ফল ও মৎস্য চাষেও তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সফল প্রকৃতিপ্রেমি হিসেবে। এই কবি গীতিকার প্রকৃতি ও মানবপ্রেমী মানুষটি ১৯৭৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার মন্নিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তার পিতার নাম মরহুম ইউনুছ আলী, মাতা মরহুমা সুরতবান। সফলতার সাথে তিনি এমএ পাশ করার পর তিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে চাকুরীতে যোগদান করেন। সুনামগঞ্জে পা রেখেই প্রথমে তিনি অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে চাকুরী করেন বিশ্বম্ভরপুর থানায়। পরে সেখান থেকে বদলী হয়ে বছর খানেক আগে একই পদে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় যোগদান করেন। এলাকার সংসদ সদস্য এডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহসহ সুনামগঞ্জের অনেক ভালো মানুষের সান্নিধ্য তাকে গড়ে তুলে সংস্কৃতিসেবী হিসেবে।

সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় যোগদান করার পর তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন থানার বর্তমান অবস্থা। জানতে পারেন থানাটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে থানার সামনে ১৭ শতক জমি পতিত থাকলেও স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ ৪৯ বছরেও এই থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করে গেছেন তারা এই পতিত জাগয়াটুকুকে কাজে লাগাতে পারেননি। দায়িত্ব পালনকালীন কেহ কোনো সময় ফুল ফল কিংবা সবজি চাষে উদ্যোগী হননি, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা পরিচর্যার জন্য এগিয়ে আসেননি।

হাজার বছরের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ শুরু হলে ওসি সহিদুর রহমান চিন্তা করেন “আমিও একটা কিছু করবো”। কিন্তু কি করবেন তা আর কাউকে বলেননি। মনে মনে স্বপ্ন ও কল্পনা নিয়ে তিনি ভাবতে বসেন। আর সেই ভাবনা থেকেই তিনি মনে মনে শপথ নেন থানার পতিত জমিটুকুকে কাজে লাগাবেন।

যেই ইচ্ছা সেই তার সফল বাস্তবায়ন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তিনি থানার পতিত জমিতে ফুল ফলের আবাদ শুরু করে দিলেন। এ কাজে তাকে সহযোগিহতা করেন তার স্ত্রী ও থানার সকল পুলিশ ফোর্সরা। কিছুদিনের ব্যবধানেই থানার দাযিত্বপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ মো. শহিদুর রহমান পতিত জমিটুকুর চেহারা পাল্টে দিলেন।

এখন থানার ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে শীতকালীন নানান ধরনের ফুল ফল ও সবজি চাষের সমারোহ। গাছে গাছে বিভিন্ন ধরনের ফুলের মৌ মৌ গন্ধে আর সবজি গাছে সবজি আসতে শুরু করায় পাল্টে গেছে থানার চারপাশের এলাকাটুকু। সহিদুর রহমান ব্যক্তি উদ্যোগে নিজের অর্থ ব্যয় করে এই ১৭ শতক জমিতে টমেটো চাষ, সিম, মূলা, মিষ্টি লাউ, পানি লাউ, লেডিস পাতা, বেন্ডি, পিঁয়াজ, রসুন, মরিচ, বেগুন, শসাসহ হরেক রকমের সবজি চাষ করেছেন।

বিভিন্ন প্রজাতির ফল ও ফুলের বাগানের পাশাপাশি হরেক রকমের সবজি চাষ করায় থানায় আসা দর্শনার্থী ও অভিযোগকারীদের পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই থানাটি। ফুলের মৌ মৌ গন্ধ উপভোগ করেন শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষেরাও। এই উদ্যোগ যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে তেমনি বিশুদ্ধ নির্মল বায়ু চারদিকে ছড়িয়ে এলাকায় একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।

জানতে চাইলে ওসি সহিদুর রহমান জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার ঘোষণা দিয়েছেন কোথাও বাড়ির পাশে কিংবা বাড়ির আঙ্গিনায় এক ইঞ্চি জায়গাও যেন খালি কিংবা পতিত না থাকে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা ও উদ্যোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আমি সদর মডেল থানায় যোগদানের পরপরই ১৭ শতক পতিত জায়গাটুকুকে পতিত না রেখে আবাদের চেষ্টা করেছি।

প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনাকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে যোগদানের পর বেতনের প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করে এই ১৭ শতক পতিত জায়গাটুকুতে শীতকালিন বিভিন্ন ধরনের ফুল, ফল ও সবজি চাষ করেছি। আমি মনে করি এই ফুল, ফল ও সবজি চাষের কারণে এখানকার পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষার পাশাপাশি আমার মতো আরো অনেকে উৎসাহিত হবে। এছাড়া এই ফরমালিনমুক্ত সবজিগুলো আমরা নিজেরা খাচ্ছি এবং থানার সকল অফিসার ও সদস্যরা নিয়মিত খাচ্ছেন। প্রতিদিন পেশাগত দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে বাগানে সময় দেন তিনি এবং পরিচর্যা করেন।

তিনি সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবতর্নের প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে তাই প্রতিটি মানুষ যার যার অবস্থান থেকে নিজ নিজ বাসাবাড়ির পতিত জায়গায় ও বাড়ির আঙ্গিনায় বিষমুক্ত ফল ফুল ও সবজি চাষ করুন যা শরীরের অনেক উপকারে আসবে। অনেক অসচ্ছল পরিবার সবজি চাষ করে তা বাজারজাত করলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ারও সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় কর্মরত এস আই প্রদীপ, এসআই অঞ্জন চন্দ্র সরকার, এস আই জিন্নাত, এস আই জালাল উদ্দিন, এসআই হুমায়ূন ও এএসআই জিয়াসহ অনেকেই বলেন, আমাদের এই সদর মডেল থানায় অফিসার ইনচার্জ হিসেবে সহিদুর রহমান স্যার যোগদানের পর পরই এই পতিত জমিটুকুকে আবাদযোগ্য করতে তিনি নিজ উদ্যোগে ফল ফুল ও সবজি চাষের দিকে ঝুকে পড়েন। এখন থানার আশপাশে হরেক রকম ফুলের মৌ মৌ গন্ধে বদলে গেছে পুরো থানা এলাকা।

অনেক দর্শনার্থী ও ফুলপ্রেমিরা অবসর সময় কাটাতে ছুটে আসেন থানার ভেতরে। আমরা মনে করি আমাদের ওসি স্যারের এ উদ্যোগে সবাই যার যার পতিত জমিটুকু পতিত না রেখে বিভিন্ন ধরনের ফল ফুল ও সবজি চাষে উদ্যোগী হয়ে নির্মল বাতাস উপভোগের পাশাপাশি নিজেরাও আগ্রহী হবেন এ ধরনের মহৎ কাজে।

সুনামগঞ্জ জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল বলেন, ওসি সহিদুর রহমান শুধু প্রকৃতি প্রেমিকই নন তিনি একজন সফল সংগীতপ্রেমীও বটে। তার রচিত গান দেশের অনেক নামকরা শিল্পীরা গেয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শানে গীতিকার সহিদুর রহমান রচিত গান রেকর্ড করেছে। আমি তার সফলতা কামনা করি।

বাউল কামাল পাশা সংস্কৃতি সংসদ সুনামগঞ্জ এর প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক সাংবাদিক গীতিকার বাউলশিল্পী আল-হেলাল বলেন, পুলিশ এর কাজ গোলাবারুদ বহন মামলা মোকদ্দমা পরিচালনা করা। কিন্তু এসব সরকারী কাজের পরও একজন মানুষ নিজের দায়িত্বের পাশাপাশি কতটুকু পরিশ্রমি হলে পরে সংগীত রচনা ও নার্সারীর বাগান, ফুল ফল ও সবজী চাষে উদ্যোগী হতে পারেন তার সার্থক ও অনন্য উদাহরণ ওসি গীতিকার সহিদুর রহমান।

যিনি শত শত ভালো কাজের পাশাপাশি অর্ধ শতাধিক গান রচনা করেছেন। সংখ্যার বিচারে কম হলেও গুণ ও মানের বিচারে তার গানগুলো একদিন মরমী সংস্কৃতির ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করবে। বিডিটুডেস/এএনবি/ ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

four × four =