English Version

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করলেন সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করলেন সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল

আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ: “তৈরী হয়ে যাও যুবক। প্রাণ নিয়ে প্রতিজ্ঞা করো। ছেড়ে দাও মরণের ভয়। ওরা আমাদের অধিকার দিতে চাইবেনা। নির্বাচনের পরেই একদফা আন্দোলন করতে হবে”। কথাগুলো তখনকার আওয়ামীলীগ কর্মী, উদীয়মান তরুণ যুবক এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল ও তার সহকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন জাতির জনক কঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন ছিল ১৯৭০ সালের ৭ই অক্টোবর মোতাবেক ২০ শে আশ্বিন রোজ বুধবার ঐদিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের সভাপতি ও বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এর শুভাগমন উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানা সদরে এক বিরাট ঐতিহাসিক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টায় দিরাই চরাবাজারে থানা আওয়ামীলীগ আয়োজিত এ সভায় অতিথির ভাষন দান করেন বঙ্গবন্ধু।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। জাতির জনকের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে হৃদয় মন্দিরে চির জাগরুক থাকা অমর কাব্যের কবি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিরাই থানা ইউনিট কমান্ডের প্রাক্তন ডেপুটি কমান্ডার জনাব এসএনএম মাহমুদুর রসুল জানান,৭০ এর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু বের হয়েছিলেন সাংগঠনিক সফরে। দিরাই থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি চন্ডিপুর নিবাসী জনাব নেজাবত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় মৎস্য বালু পাথর ধান আর আউল বাউল ফকিরের দেশ দিরাই থানায় বঙ্গবন্ধুর শুভাগমনকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে দিরাই শাল্লা জামালগঞ্জ ধর্মপাশা  আসনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের মনোনিত এম.এন.এ পদপ্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদ, সুনামগঞ্জ মহকুমা আওয়ামীলীগ নেতা সাবেক মন্ত্রী দিরাই শাল্লা নির্বাচনী এলাকায় নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগ মনোনিত প্রার্থী বাবু অক্ষয় কুমার দাশ, সুনামগঞ্জ মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি এমএনএ পদপ্রার্থী দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী,এডভোকেট রইছ উদ্দিন ও দিরাই থানা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুল কদ্দুছ প্রমুখ।

২৭ বছর পূর্বের বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে ৭১ এ ট্যাকেরঘাট সাবসেক্টরের প্লাটুন পরবর্তীতে কোম্পানী কমান্ডার এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল (ময়না মাস্টার) জানান, পাক ওয়াটার ওয়েজ নামক লঞ্চযোগে ভৈরব শেরপুর ও আজমেরীগঞ্জ অতিক্রম করে পথিমধ্যে কয়েকটি পৃথক বিশাল জনসভায় ভাষন দান শেষে সকাল ১১টায় দিরাই ডাকবাংলায় এসে পৌছান বঙ্গবন্ধু। সেখানে ভাটি বাংলার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে তিনি এক মত বিনিময় সভায় মিলিত হন। তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ডন পত্রিকাসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার ১২ জন সাংবাদিকও ছিলেন। ডিসেম্বরের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ভবিষ্যত নিয়ে স্থানীয় সকল নেতাকর্মীরা সন্দেহভাজন ছিলেন। জনাব এসএনএম মাহমুদুর রসুল ও তার বড় ভাই ভরারগাঁও নিবাসী আওয়ামীলীগের প্রবীণ সংগঠক ভাষা সৈনিক আব্দূন নূর চৌধুরী সন্ধ্যায় পাক ওয়াটার ওয়েজ লঞ্চের দুতালায় সমবেত নেতাকর্মীদের সম্মুখে বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আওয়ামীলীগ কয়টি আসন পাবে। বঙ্গবন্ধু স্বগর্বে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ২২টি আসনের জন্য সন্দেহ হচ্ছে। তবে সবগুলো আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আমরা জয়ী হবো। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ২২টি আসনে পিডিপি ও মুসলিম লীগের প্রার্থীদেরকে যেভাবেই হউক পরাজিত করতে হবে। এজন্য আমাকে একটু পরিশ্রম করতে হবে।

এ সমস্ত প্রার্থীদের নাম জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু ২২ জনের নাম বললেন। এরা হচ্ছে চট্রগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী, মৌলানা ফরিদ আহমদ, সুনামগঞ্জের মাহমুদ আলী, খুলনার সবুর খান, কুষ্টিয়ার শাহ আজিজুর রহমান, ফরিদপুরের ওয়াহিদুজ্জামান, আকমল ইবনে ইফসুফ, কাজী কাদের, জমীর উদ্দিন প্রধান, ঢাকার খাজা খয়ের উদ্দিন, নান্দাইলের নুরুল আমিন, বরিশালের আজিজুল হক, পীর মুসলেহ উদ্দিন, আনম ইউসুফ, আতাউর রহমান খান, এসএম সুলায়মান, আব্দুল জব্বার খান, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, রিয়াজ উদ্দিন ভোলা মিয়া প্রমুখ। বাকী ৩ জনের নাম এস.এন.এম. মাহমুদুর রসুলের স্মরণ নেই। সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন নৌকা ও আওয়ামীলীগের স্বপক্ষে ব্যাপক জনমত ও গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। যে জোয়ারে পাকিস্তানে মুসলিম লীগের তাবেদার স্বৈরশাসকদের মসনদ কেঁপে  উঠেছিল। নির্বাচনের ফলাফলে শুধু বঙ্গবন্ধু বা আব্দুস সামাদ আজাদ বিজয়ী হননি। প্রায় সব প্রার্থীরাই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে। মুসলীম লীগ পিডিপি পায় মাত্র দুটো আসন।

১৭ ই ডিসেম্বরের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মোট ৩০০ টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ ২৮৮ টি আসন পেয়ে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় দিরাই শাল্লা আসনে অক্ষয় কুমার দাশ পরাজিত হন। এখানে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন ন্যাপের প্রার্থী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত (দুখু সেন)। দুটি বিপরীতমুখী সংগঠনের নেতা হলেও সেদিন সামাদ আজাদ ও সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত একই মেরুতে অবস্থান করতেন। উভয়ের চিন্তাধারা ছিল এলাকার আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য ও শোষনের যাতাকল থেকে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জন। জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর দিরাই অবস্থানকালে শ্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত তার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত জাতির এ অবিসংবাদিত নেতাকে প্রণাম করেন। বঙ্গবন্ধু তাকে পাশে বসিয়ে প্রায় দেড়ঘন্টা সময় আলোচনা করেন। দুনেতার মধ্যে স্বাধীনতা স্বায়ত্বশাসন গণতন্ত্র  এবং পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে ৭ কোটি বাঙ্গালীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আলোচনা হয়। অবশ্য কথোপকথনে সুরঞ্জিতকে বঙ্গবন্ধুর ভালো লেগেছিলো। সেজন্য তিনি আওয়ামীলীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণ অনেকদিন পর গ্রহণ করলেন পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত। ৯২-তে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে তিনি যোগ দেন আওয়ামীলীগে। সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত একদিন বলেছিলেন যে, জীবনে যারা একবার বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছে অথবা তার কথা শুনেছে কিংবা তাঁকে স্বচক্ষে প্রত্যেক্ষ করেছে তারাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণীত হয়ে আওয়ামীলীগে যোগ দিয়েছে।

যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর শুভাগমনে আব্দুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে শোসিত বাংলার অবহেলিত ভাটি এলাকার জনগনের পক্ষ থেকে আওয়াজ উঠেছিল, “বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। কালনী পৈন্দা কুশিয়ারাসহ সকল ভরাট নদীর খনন চাই। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ কর করতে হবে। সহজলভ্য কৃষি ঋন ও চাষাবাদের জন্য যান্ত্রিক ব্যবস্থার বন্দোবস্ত কর। জলমহালে মৎস্যজীবিদের অধিকার দিতে হবে। আইয়্যুব গেছে যে পথে ইয়াহিয়া যাবে সে পথে। হৈ হৈ রৈ রৈ খান চোরারা গেল কই। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। দিরাই শাল্লার মাটি বঙ্গবন্ধুর ঘাটি। এক দফা এক দাবী ইয়াহিয়া তুই কবে যাবি। ডাক দিয়েছে মুজিব ভাই ইয়াহিয়া তোমার রক্ষা নাই। আইয়্যুব ইয়াহিয়া নিপাত যাক বাঙ্গালী মুক্তি পাক” শ্লোগান ধ্বনী।

প্রকাশ করা আবশ্যক যে, বঙ্গবন্ধু দুবার দিরাই সফর করেন। ৭৩ এর সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নৌকা প্রতীকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদের সমর্থনে সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায়ও তিনি এসেছিলেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সামাদ আজাদ বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্টতম সহযোগী ছিলেন। হয়তো এ কারনেই বঙ্গবন্ধুর জীবদ্ধশা থেকে শুরু করে অদ্যাবদি তিনি আওয়ামীলীগের পতাকাতলে আছেন এবং থাকবেন। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর খুনী মোশতাক জিয়া এরশাদ প্রমুখ স্বৈরশাসকচক্র তাঁকে বারবার দলে ভিড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু তিনি তাদেরকে পাত্তা দেননি। এজন্য বারবার এই বয়োবৃদ্ধ নেতাকে যেতে হয়েছে কারাগারে। জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যা করার সময় তিনিও কারাগারে ছিলেন। ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। নীতি ও আদর্শ থেকে কেউ তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এজন্য দিরাইবাসী সামাদ আজাদকে নিয়ে আজোও গর্ববোধ করে।

উল্লেখ্য, যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এস.এন.এম মাহমুদুর রসুল প্রতিবেদক লেখক সাংবাদিক আল-হেলালের পিতা। গত ২৮ মে ১৯৯৭ইং এই প্রতিবেদনটি তৎকালীন দৈনিক খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।  সিলেট বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক সাহেব দিরাই সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা আল-হেলাল প্রদত্ত এ স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি দৈনিক খবর পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। বিডিটুডেস/এএনবি/ ৩১ আগস্ট, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

17 + eight =