English Version

১৪ জুন আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস ও আমাদের কিছু প্রশ্নোত্তর

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

কে এস এম আরিফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার: প্রত্যেক রক্তদাতাই একজন বীর আর আপনি যদি একজন মানুষকে একবার রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, তার মানে কিন্তু শুধু ১ ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করা নয়; এর মাধ্যমে আপনি হয়তো একজন নিয়মিত রক্তদাতা সৃষ্টি করতে পারবেন। আমি আগে একটি গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়েছিলাম যে, একজন মানুষ তার জীবনে সর্বোচ্চ ১৭২ বার রক্তদান করতে পারেন। তারমানে দাঁড়াচ্ছে, একজন রক্তদাতা সৃষ্টির মাধ্যমে আপনি সর্বোচ্চ ১৭২ ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করতে পারবেন, মানে ১৭২ জন রোগীর জীবনরক্ষক হতে পারবেন। আর যারা স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদান করে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচাচ্ছেন তাদেরসহ সাধারণ জনগণকে রক্তদানে উৎসাহিত করাই এ দিবসের উদ্দেশ্য।

আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস কি ও কেন:-

১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস পালন এবং ২০০০ সালে ‘নিরাপদ রক্ত’-এই থিম নিয়ে পালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৪ সালে প্রথম পালিত হয়েছিল বিশ্ব রক্তদান দিবস। ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য অধিবেশনের পর থেকে প্রতিবছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ দিবস পালনের জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে।

প্রতিবছর ৮ কোটি ইউনিট রক্ত স্বেচ্ছায় দান হয়, অথচ এর মাত্র ৩৮ শতাংশ সংগ্রহ হয় উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে, যেখানে বাস করে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া এখনো বিশ্বের অনেক দেশে মানুষের রক্তের চাহিদা হলে নির্ভর করতে হয় নিজের পরিবারের সদস্য বা নিজের বন্ধুদের রক্তদানের ওপর, আর অনেক দেশে পেশাদারি রক্তদাতা অর্থের বিনিময়ে রক্ত দান করে আসছে রোগীদের। অথচ বিশ্বের নানা দেশ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে জানা যায়, ‘নিরাপদ রক্ত সরবরাহের’ মূল ভিত্তি হলো স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে দান করা রক্ত। কারণ তাদের রক্ত তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং এসব রক্তের মধ্য দিয়ে গ্রহীতার মধ্যে জীবনসংশয়ী সংক্রমণ, যেমন এইচআইভি ও হেপাটাইটিস সংক্রমণের আশঙ্কা খুবই কম।

স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে রক্তদানকারী আড়ালে থাকা সেসব মানুষের উদ্দেশে, এসব অজানা বীরের উদ্দেশে, উৎসর্গীকৃত ১৪ জুনের বিশ্ব রক্তদান দিবস। ১৪ জুন দিবসটি পালনের আরও একটি তাৎপর্য রয়েছে। এদিন জন্ম হয়েছিল বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টিনারের। এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছিলেন রক্তের গ্রুপ ‘এ, বি, ও,এবি’

এখন প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ লোক রক্তদান করে থাকে। কিন্তু রক্তের প্রয়োজন আরো বেশি। কেউ যখন স্বেচ্ছায় নিজ রক্ত অন্য কারো স্বার্থে দান করে তখন তাকে রক্তদান বলে। প্রতি বছর জুনের ১৪ তারিখে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস উদযাপন করা হয়। আর ২রা নভেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় রক্তদাতা দিবস পালন করা হয়।

রক্তদানের জন্য রক্তদাতার অবশ্যই সম্মতির প্রয়োজন । কিন্তু অনেকেই রক্ত দিতে ভয় ও দ্বিধায় ভোগেন। রক্তদান নিয়ে অনেকের মনে অনেক প্রশ্নও থাকে। আবার অনেক সময় অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনায় রক্তক্ষরণ, প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, রক্তের ক্যান্সার, রক্তশূন্যতা, হিমোফিলিয়া, থ্যালাসেমিয়া, ডেঙ্গুসহ রক্তের স্বল্পতাজনিত অন্যান্য যে কোনও রোগের চিকিৎসায় রোগীর শরীরে কৃত্রিম উপায়ে রক্ত সঞ্চালন করবার প্রয়োজন পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেকটা সামনে এগিয়ে গেলেও রক্তের কোনও বিকল্প উপাদান আজতক তৈরি হয়নি। আর তাই সঠিক সময়ে রক্তের অভাবে প্রাণ নাশের ঘটনা এখনও বিরল নয়। রোগীকে কেবল রক্ত দিলেই হবে না, দিতে হবে রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে “ও নেগেটিভ” হচ্ছে সার্বজনীন দাতা। অর্থাৎ এই গ্রুপের রক্ত অন্য যে কোনও গ্রুপের মানুষকে দেয়া যায়। কিন্তু “ও নেগেটিভ” নিজে অন্য কোনও গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করতে পারে না। এবং প্রকৃতির কোনও এক অদ্ভুত খেয়ালে এই “ও নেগেটিভ” একটি দুষ্প্রাপ্য ব্লাড গ্রুপ। রক্ত সঞ্চালনের সময় যেমন অনেক কিছু বিবেচনায় রাখতে হয়, তেমনি রক্তদানের সময়েও বিবেচনা করতে হবে অনেক কিছু। কেবল রক্ত দান করতে চাইলেই হবে না, আপনি রক্ত দানের উপযুক্ত কিনা সেটিও জানতে হবে। আসুন, জেনে নেয়া যাক রক্তদানের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা।

রক্তদানের জন্য কী কী যোগ্যতা দরকার :-

►রক্ত দাতার বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।

►একজন সুস্থ সবল মানুষের জন্য নিয়মিত রক্তদানের পূর্বশর্ত হল-”স্বদিচ্ছা”।

► জ্বর, সর্দি, কাশি সুস্থ্য হবার কমপক্ষে ১ সপ্তাহ্ পর রক্তদান করা যাবে।

►বিগত ৬(ছয়) মাসের মধ্যে যদি আপনার বড় কোন অপারেশন না হয়ে থাকে।

►রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ, ব্লাড প্রেসার এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে হবে।

►শারীরিক ওজনঃ- মেয়েদের ক্ষেত্রে ৪৭ কেজি এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ৫০ কেজি বা এর বেশি হতে হবে।

►স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে পুরুষরা বছরে ৪ বার এবং নারীরা বছরে সর্বোচ্চ ৩ বার রক্তদান করতে পারবে।

►ব্লাড সুগার স্বাভাবিক লেভেলে থাকলে, ডায়াবেটিস রোগীও রক্তদান করতে পারবে।

►এলকোহল পানের কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা পর রক্তদান করা যাবে। ধূমপায়ীগণ রক্তদান করতে পারবেন। তবে, স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা সাপেক্ষে এগুলো বর্জন করা উচিত।

রক্তদানের জন্য অযোগ্যতা কী কী :-

► নারীদের ক্ষেত্রে- গর্ভাবস্থায় এবং মেয়েলি সমস্যা চলাকালিন সময় রক্ত দিতে পারবেনা।

►রক্তবাহিত রোগ যেমন-ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, জন্ডিস, মৃগীরোগ,

গনোরিয়া, হেপাটাইটিস, এইডস, চর্মরোগ, হৃদরোগ, ডায়বেটিকস, টাইফয়েড এবং বাতজ্বর থাকলে রক্তদান করতে পারবে না।

► কোন প্রকার টিকা গ্রহণ করলে ২৮ দিন পর এবং এন্টিবায়োটিক ঔষধ সেবন করার ৭ দিন পর রক্ত-দান করা যাবে।

যারা রক্ত দান করবেন তাদের জন্য উপকারিতা:-

►প্রতিবার রক্তদানের পর রক্তদাতার অস্থিমজ্জা (Bone marrow) নতুন রক্ত কণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয়।ফলে রক্তদানের দুই সপ্তাহের মধ্যে সে ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।

►শরীরের রক্ত কণিকা গুলোর মধ্যে লোহিত রক্ত কণিকার আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ ১২০ দিন। তাই ৪ মাস অর্থাৎ ১২০ দিন পর পর রক্তদানে শরীরের কোন ক্ষতি নেই।

►রক্তদাতার রক্তে HIV, Hepatitis-B, Hepatitis-C, Syphilis & Malarial Parasite এর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। রক্তদাতা রক্তদানের ফলে এ টেস্টগুলো বিনামূল্যে করার সুযোগ পাচ্ছেন।

►রক্তদানের ফলে রক্তে Cholesterol এর পরিমাণ কমে, ফলে হৃদরোগের সম্ভাবনা ৩৩ ভাগ কমে যায়।

►রক্তদানে শরীরের Free radicals এর পরিমাণ কমে যায়। তাই বার্ধক্যজনিত জটিলতা দেরিতে আসে।

►স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানসিক প্রশান্তি আসে। কারণ প্রতি ২ সেকেন্ডে বিশ্বে এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। আপনার দেওয়া রক্তই একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।

►সম্প্রতি ইংল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত রক্তদান ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক।

►মানুষ হিসেবে মানুষের উচিত অন্যের সেবায় এগিয়ে আসা। আপনার দেওয়া একব্যাগ রক্ত যদি একটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে তবে অবশ্যই সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতিরে রক্তদানে এগিয়ে আসা উচিত।

►এখন পর্যন্ত গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে রক্তদানের কোন অপকারিতা ধরা পরে নাই।

রক্তদানের সম্পর্কীয় ধর্মীয় গুরুত্ব:-

►রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত পুণ্যের বা সওয়াবের কাজ। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নং আয়াতে আছে, ‘’একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সমগ্র মানব জাতির জীবন বাঁচানোর মতো মহান কাজ”।

►ঋগ্‌বেদে বলা হয়েছে ‘‘নিঃশর্ত দানের জন্যে রয়েছে চমৎকার পুরস্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব’’। (ঋগবেদঃ ১/১২৫/৬)।

রোজা রাখা অবস্থায় কি রক্তদান করা যাবে প্রসঙ্গে::

রোজা ভঙ্গের নির্দিস্ট কারণসমূহে রক্তদান করাকে রোজা ভঙ্গের কারণ বলে উল্লেখ করা নেই। যেহেতু রক্তদানের পরে যতদ্রুত সম্ভব শরীরে পানি এবং গ্লুকোজের যোগান দেয়াটা খুব জরুরী সেহেতু ইফতারের পরেই রক্তদান করাটা উত্তম। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত রক্তের প্রয়োজন হয়। এই ক্ষেত্রে মানবিক বিষয়টাকেই বড় করে দেখা উত্তম। কেননা ধর্ম আমাদের মানবিক হবার শিক্ষা দেয়। তবে, রোজা রেখে রক্তদান করাটা রক্তদাতার শারীরিক সামর্থ্যের উপরেই নির্ভর করে। এক্ষেত্রে অযথা বাড়াবাড়ি করা একদমই উচিত নয়।

রক্তদান নিয়ে আপনার মনের কিছু জরুরি প্রশ্ন এবং তার উত্তরঃ-

১) রক্ত দানের জন্য সর্বনিম্ন বয়স?
–> আপনি ইচ্ছে করলে ১৭ বছর বয়সের পর
থেকেই রক্ত দান করতে পারেন।

২) রক্ত দান কি নিরাপদ ?
–> রক্ত দান করা সম্পূর্ন নিরাপদ।

৩) রক্ত দানের কি কোন সাইড এফেক্ট
আছে ?
–> না রক্ত দানের কোন সাইড এফেক্ট
নাই।

৪) রক্ত দানে কতটুকু রক্ত নেওয়া হয় ?
–> আপনার শরীর থেকে প্রায়
380-400মি.লি রক্ত নেওয়া হয়।

৫) কতদিন পর পর রক্ত দান করা যায় ?
–> স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে পুরুষ-রা প্রতি
৩ মাস অন্তর-অন্তর, আর নারীদের
ক্ষেত্রে ৪ মাস অন্তর-অন্তর রক্ত-দান
করতে পারবেন।

৬) রক্ত দান করতে কত সময় লাগে ?
–> সর্বোচ্চ 10 মিনিট সময় লাগে।
বিশ্রাম এবং রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষাসহ
সর্বমোট ১.৫ ঘন্টা লাগতে পারে।

৭) রক্ত দান করতে ব্যাথা লাগে কি ?
–> জ্বী না। রক্ত দানের সময় আপনি
ব্যাথা পাবেন না।

৮) রক্ত দানের ফলে আমার কি অঙ্গান
হয়ে পড়তে পারি ?
–>না, তবে রক্ত-দান করার পর অবশ্যই
কমপক্ষে ৫ মিনিট বিশ্রাম নিবেন।

৯) কিভাবে রক্ত নেওয়া হয় ?
–> প্রথমে আপনার বাম হাত থেকে আধা
সিরিজ রক্ত নেওয়া হয়, ক্রস মেসিং ও
অন্যান্য পরীক্ষা করার জন্য। তারপর
আপনার ডান
হাতের বাহুতে একটি সিরিন্জ দিয়ে
রক্তটানার ব্যাবস্থা করা হয়। নিডিলটি
ঢোকানোর সময় সামান্য ব্যাথা লাগে।
তারপর আর ব্যাথা লাগবে না। আপনার
রক্ত একটি নলের মাধ্যমে স্যালাইনের মত
একটি ব্যাগে সহজেই জমা হয়ে যায়।

১০) রক্ত দানের জন্য সর্বনিম্ন ওজন
কতটুকু ?
–> মেয়েদের ক্ষেত্রে ৪৭ কেজি এবং
ছেলেদের ক্ষেত্রে ৫০
কেজি বা এর বেশি হতে হবে।

১১) রক্ত দানের পর হাত ফুলে বা রক্ত
জমাট বেধে বা ইনফেক্সন
হতে পারে কি ?
–> হাতের যেখান থেকে রক্ত নেয়া
হয়েছে সেখানে ম্যসেজ করবেন
না। ফুলে যাওয়া, জমাট বাধা বা
ইনফেক্সনের সম্ভবনা নেই বললেই চলে।

১২) এলকোহল ( মদ) খাবার পর রক্ত দান
করা যায় কি ?
–> না । রক্ত দেবার ২৪ ঘন্টা মধ্যে
এলকোহল পান করলে রক্ত দান করা যাবে
না। পান করার ২৪ ঘন্টা পর রক্ত দিতে
পারেন।

১৩) এন্টিবায়টিক ওষুধ খাওয়া অবস্থায়
রক্ত দান করা যাবে কি ?
–> না। এন্টিবায়োটিক খাবার অন্তত ৭
দিন পর, সম্পূর্ন সুস্থ হলে তারপর রক্ত দান
করা যাবে।

১৪) ব্লাড প্রেশারের রোগী রক্ত দান
করতে পারবেন কি ?
–> হ্যা। যদি আপনার রক্তচাপ
নিয়ন্ত্রনে থাকে আপনি রক্ত দান করতে
পারেন।

১৫) শিশু বুকের দুধ খায় এ অবস্থায় রক্ত
দান করা যাবে ?
–> না। যখন শিশু শুধুমাত্র বুকের দুধ পান
করে তখন রক্ত দান করা যাবে না।

১৬) শিশুর জন্মের কতদিন পর মা রক্ত-দান
করতে পারেন ?
–> শিশুর জন্মের ১৫ মাস পর মা রক্তদান
করতে পারেন।

১৭) সর্দি লাগা/ জ্বর থাকা অবস্থায় রক্ত
দান করা যাবে ?
–> ঠান্ডা বা সর্দি লাগা অবস্থায়
যেহেতু একটি জীবানু সংক্রামন
থাকে সেহেতু রক্ত দান করা যাবে না।

১৮) জন্ম নিয়ন্ত্রন পিল খাবার সময় রক্ত
দান করা যাবে কি ?
–> হ্যা। জন্ম নিয়ন্ত্রন পিল খাবার সময়
রক্ত দান করা যাবে।

১৯) ডায়বেটিক রোগী রক্ত দান করতে
পারেন ?
–> যে সমস্ত ডায়াবেটিক রোগী
ইনসুলিন গ্রহন করেন তাদের রক্ত
দান না করাই ভালো। তবে বিশেষ
প্রয়োজনে তারা রক্ত দান করতে
পারেন।

২০) রোগের ভ্যাকসিন নেবার পর রক্ত
দান করা যাবে ?
–> না। ভ্যাকসিন নেবার অন্তত ২৮ দিন
পর্যন্ত রক্ত দান করা যাবে না।

২১) রক্ত দানের আগে আমার কি করা
উচিত ?
–> আগের রাতে ভাল ভাবে ঘুমান।
সকালে ভাল নাস্তা করুন।
ক্যাফেইন যুক্ত পানীয় ( চা , কফি)
খাবেন না। বেশী চর্বিযুক্ত খাবার
খাবেন না। পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

২২) রক্ত দানের সময় কি করা উচিত ?
–> হাফ হাতা পোষাক পরুন। রিল্যাক্স
থাকুন। রক্তদান শেষে পর্যাপ্ত বিশ্রাম
নিন।

২৪) রক্ত দানের পর কি করা উচিত ?
–> রক্ত দানের পর পর্যাপ্ত তরল পান করুন
অন্তত ৪ গ্লাস ( স্যালাইন, ফলের রস)। ৫
ঘন্টা পর্যন্ত ভারী কাজ করবেন না।
মাথা ঘুরলে শুয়ে পড়ুন, এবং পা মাথার
চেয়ে উচুতে রাখুন (পায়ের নীচে একটি
বালিশ দিন)। দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকুন।
ধুমপান করবেন
না অন্তত ১ ঘন্টা।

রক্তদানের উপকারিতা সমূহ:-

রক্তদানের প্রথম এবং প্রধান কারণ,একজনের দানকৃত রক্ত আরেকজন মানুষের জীবন বাঁচাবে।রক্তদান স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। রক্তদান করার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয় এবং রক্তদানের ২ সপ্তাহের মধ্যে নতুন রক্তকণিকার জন্ম হয়ে ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। বছরে ৩ বার রক্তদান আপনার শরীরে লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা বাড়িয়ে তোলার সাথে সাথে নতুন কণিকা তৈরির হার বাড়িয়ে দেয়।

উল্লেখ্য রক্তদান করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেহে রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায়। নিয়মিত রক্তদান করলে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। আরেক গবেষণায় দেখা যায়, যারা বছরে দুই বার রক্ত দেয়, অন্যদের তুলনায় তাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। বিশেষ করে ফুসফুস, লিভার, কোলন, পাকস্থলী ও গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি নিয়মিত রক্তদাতাদের ক্ষেত্রে অনেক কম পরিলক্ষিত হয়েছে। চার বছর ধরে ১২০০ লোকের ওপর এ গবেষণা চালানো হয়েছিলো। নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে নিজের শরীরে বড় কোনো রোগ আছে কিনা তা বিনা খরচে জানা যায়। যেমন : হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস, এইচআইভি (এইডস) ইত্যাদি।

প্রতি পাইন্ট (এক গ্যালনের আট ভাগের এক ভাগ) রক্ত দিলে ৬৫০ ক্যালরি করে শক্তি খরচ হয়। অর্থাৎ ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে

আবার অনেকেই রক্তদানকে অতিউৎসাহিত হয়ে প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড মনে করে থাকেন। শেষ রক্তদানের তিন মাস পূর্ণ হবার আগেই তারা রক্তদান করে থাকেন। এটা একদমই উচিত নয়। কেননা, রক্তের (RBC) অর্থাৎ Red Blood Cell বা, লোহিত রক্তকণিকা, যা পরিপুর্ণ হতে ১২০দিন অর্থাৎ ৪মাস লাগে। সুতরাং চার মাস পরপরই রক্তদান করাটা উত্তম। (এই বিষয়ে অনেক রক্তদাতার সাথে আমার তর্ক বিতর্কও হয়েছে)। অতএব, ৪মাস পরপরই রক্তদান করাটা চিকিৎসক কতৃক নির্দেশিত।

পরিশেষে একটাই কথা। রক্ত কোন ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট না, যে অর্ডার করলেই তৈরি করে দেয়া যায়। এর প্রয়োজন কেবল রক্ত দ্বারাই পূরণ করা সম্ভব, অন্যথায় না। এমন সময় আসতে পারে, যখন রক্তের অভাবে আপনি নিজেই মৃত্যুপথযাত্রী। সুতরাং, আসুন, অঙ্গীকার করি। “রক্ত দেই জীবন বাঁচাই”।

লেখক::

কে এস এম আরিফুল ইসলাম
সাংবাদিক ও সিনিয়র সহকারী শিক্ষক
দারুল আজহার ইনস্টিটিউট
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

eleven − 7 =