English Version

১৯৭১ সালের ১১ই ডিসেম্বর ডিমলা যেভাবে মুক্ত হয়েছিলো

পোস্ট টি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

মহিনুল ইসলাম সুজন, নীলফামারী: ১১ই ডিসেম্বর নীলফামারীর ডিমলা মুক্ত দিবস।১৯৭১সালের এইদিনে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ডিমলা পাক হানাদার মুক্ত করে বীর সন্তানেরা।

ইতিহাস: ডিমলার উত্তর দিকে বাংলাদেশ ভারতের বর্ডার, আর এই অঞ্চলে হানাদার বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নেওয়া ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু ডিমলার উত্তর অঞ্চলটি ছিলো ভারতের বর্ডার সে কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান বর্ডারের কাছাকাছি। আর পাকিস্তানীরাও সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প তৈরি করেন। আর উত্তর দিকে বালাপাড়া ইউনিয়নের ডাঙ্গার হাট এবং পূর্বে বর্তমান তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ছিলো মুক্ত অঞ্চল।

ডিমলায় যে সব এলাকায় হানাদার ক্যাম্প ছিলো তা হলো: বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ১টি, টুনিরহাট বাজারে ১টি, খগার হাটে ১টি, শঠিবাড়ি বাজারে ১টি ও ডিমলা সদরের বর্তমানে ডিমলা উপজেলা পরিষদে ১টি ও রামডাঙ্গা পূরান থানায় ১টি। এসব ক্যাম্প পরিচালনা হত ডিমলা সদরের দুটি ক্যাম্প হতে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনিদের প্রতিটি ক্যাম্পে ভারি সব অস্ত্রে সুসজ্জিত। আর এসব ক্যাম্প তৈরি করতে যে সকল ইট ও টিন ব্যাবহার হয়েছিল তা বর্তমান সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আফতাব উদ্দিন সরকার বাড়ি হতে প্রায় ২ লাখ পিস ইট নতুন বাড়ি তৈরি করার নতুন দুটি ২০০ হাতের বড় বড় টিনের ঘড় লুট করে নিয়ে যায় তারা। ঐ দিকে ডিমলার সমগ্র উওর অঞ্চল ছিলো মুক্তিযোদ্ধার দখলে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা পদ্ধতিতে উত্তর দিক হতে দক্ষিণ দিক দিয়ে যুদ্ধ করতে করতে সামনের দিকে অগ্রসর হবে এটাই ছিলো মূল পরিকল্পনা। ভারত থেকে সদ্য ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ডিমলাকে ৬টি কোম্পানি বা অঞ্চলে ভাগ করে নেন তাদের অবস্থান।

সেগুলো স্থান হলো: ১। দক্ষিণ বালাপাড়া অঞ্চলে মাহাবুব কোম্পানী।২।ঠাকুরগঞ্জ অঞ্চলে মনির কোম্পানি। ৩।টুনির হাট ভাড়ালদাহ অঞ্চলে সিদ্দিক কোম্পানী।৪।কলোনী দোহলপাড়া অঞ্চলে রওশন কোম্পানী। ৫।রহমানগঞ্জ ও টেপাখড়িবাড়ি অঞ্চলে হারেছ কোম্পানী।৬।তিস্তা নদীর তীর অঞ্চল দেখতেন মতিন কোম্পানী।এই ৬টি কোম্পানীর মুক্তিযোদ্ধারা যে সকল অস্ত্র ব্যাবহার করেছিল তা হলো: এস,এল,আর থ্রি নট থ্রি রাইফেল,এল,এম,জি টুইন্স মটার, সর্টমেশিন গান, এন্টিপারসোনাল ১৬ মাইন, এন্টিপারসোনাল ১৪ মাইন সহ আরও বেশ কিছু অস্ত্র।

১৯৭১ সালে বছরের প্রথম থেকেই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে হানাদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়। লেগে যায় দাঙ্গা, অত্যাচার, হামলা, লুট। মূল যুদ্ধ শুরু হয়ে য়ায়। বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৭ মার্চের ভাষনের পর। আমাদের ডিমলা অঞ্চলের মূল যুদ্ধশুরু হয় অক্টোবর মাস থেকে। এর পূর্বে চলছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুতি গ্রহণ ও যুদ্ধের পরিকল্পনা।

ডিমলার প্রথম যুদ্ধ ১০ই অক্টোবর ১৯৭১: রাজাকার বাহিনীদের একটা টহল টিম ডাঙ্গার বালাপাড়া ইউনিয়ন হাটের বেশ কয়েকটি গ্রামে মুক্তিবাহিনীর মুক্ত অঞ্চলে প্রবেশ করে। অস্ত্র দেখিয়ে লুটতরাজ শুরু করে মুক্ত অঞ্চলের মানুষের ঘর বাড়ি। গ্রামবাসি একজন রাজাকারকে অস্ত্র সহ ধরে ফেলেন। ধরতে গিয়ে ডাঙ্গার হাটের জব্বার মেম্বারসহ বেশ ক একজন আহত হন। রাজাকার ধরার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পরায় মাহাবুব কোম্পানির বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধা সেই রাজাকারকে বেধে ধরে নিয়ে যান মুক্ত অঞ্চলের ক্যাম্পে।

পরে সেই রাজাকারকে ৬ নং সেক্টর ভারতের দেওয়ানগঞ্জে পাঠানো হয়। ইতি মধ্যে পাক বাহিনী ক্যাম্প ডাংগারহাটে সে খবর গেলে তারা প্রতিশোধের নেশায় উম্মাদ হয়ে যায়। আমাদের মুক্তিবাহিনী উপর আক্রমনের নেশায় তারা প্রতিশোধের নীল নকশা বুনতে শুরু করে। গোপনে তারা রাজাকারের মাধ্যমে খবর নিতে থাকেন। মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের খবর তারা সংগ্রহ করে দক্ষিণ বালাপাড়া বাসুয়াল ঘাটিয়ালের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নিশ্চিত হন। তাদের তথ্য সংগ্রহ করতে সময় লেগে যায় প্রায় ৮ দিন।

১৮ই অক্টোবর ১৯৭১: ঠিক সকাল অনুমান ৮/৯ টা পাক হানাদার বাহিনী আক্রমনের প্রস্তুতি নেয়। এই অঞ্চলের দ্বায়িত্বে রয়েছে মাহাবুব কোম্পানি। অপরদিকে বেলুজ রেজিমেন্টের মেজর জহুরুল হকের নেতৃত্বে হানাদার বাহিনীর ১০০ থেকে ১২০ জনের একটি দল। আর আমাদের মাত্র ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা যথাক্রমে-সেলিম(রংপুর, গঙ্গাচরা), মোহাম্মদ আলী(খুলনা), হযরত আলী(কুড়িগ্রাম), মটারম্যান আবদুস সামাদ (লালমনিরহাট), সেকশন কমান্ডার আফজাল(বগুরা), আশরাফ আলী ও নাম না জানা দুজনসহ সবাই সেদিন পাক হানাদারদের প্রতিহত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। এক পর্যায়ে চারিদিক দিয়ে থেকে ঘিড়ে ফেলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধা মানিক আটকা পরে। সাথে সাথে বন্দুকের বেয়নেটের মাথায় মানিককে গেথে ফেলে মূহূর্তে চারিদিক হানাদার বাহীনিরা ব্রাশ ফায়ার শুরু করে।

সেখানে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলিকে বেওনেট দিয়ে খুচিয়ে ও পরে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। গোলাগুলির শব্দ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে ঘন্টা খানেকের মধ্যে পাশে থাকা আমাদের মুক্তিবাহিনীর ৪টি কোম্পানী মাহাবুব, সিদ্দিক, রওশন ও মনির কোম্পানির দ্রুত যুদ্ধ স্থানে চলে আসে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে। এত বড় মুক্তিযোদ্ধার বাহিনি দেখে পাক বাহিনী পিছু হটতে থাকে। পিছু হটার সময় ৮০ থেকে ৮২টি ঘড় বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং ১০ থেকে ১৫ জন গ্রামবাসিকে ধরে নিয়ে যায় ডাঙ্গার হাট ক্যাম্পে(বর্তমান বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে)। পিছু হটার পর সেই স্থানে মোহাম্মদ আলীর পরে থাকা ক্ষত-বিক্ষত নিথর রক্তমাখা দেহটিকে উদ্ধার করে মুক্ত অঞ্চলে নিয়ে যায় সহযোদ্ধা বৃন্দ। বর্তমানে পশ্চিম ছাতনাই ঠাকুরগঞ্জ বাজারে মসজিদের সাথে তাকে সমাহিত করা হয়।

আর ধরে আনা সাধারণ মানুষের উপর চলে সেই রাতে সারারাত ব্যাপি অমানবিক নির্যাতন। পরের দিন সকালে যাদের কপালে পিচ কমিটির সুপারিশ জুটে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আর বাকিদের…….। ১৯ই অক্টোবর ১৯৭১ ডাঙ্গারহাট ট্রাজেটি: আগের দিন ধরে আনা দক্ষিণ বালাপাড়ার ৮ জন সাধারণ মানুষকে, গোমনাতি নিয়ে যাওয়ার পথে (বর্তমান বালাপাড়া বদ্ধভূমি) সেখানে ধরে আনা সাধারণ গ্রামবাসীকে নির্বিচারে বেয়নেট চার্জ ও গুলি করে হত্যা করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি বদ্ধভূমি রয়েছে।

২২শে অক্টোবর ১৯৭১ স্থল মাইন আক্রমন: খানসেনার ডাঙ্গার হাট ক্যাম্প হতে গোমনাতি চৌরঙ্গীর রাস্তায় একটি টহল টিম প্রতি নিয়ত টহল দিতেন। কারণ ঐ সড়কটি তারা নিরাপদ মনে করতেন কিন্তু আমাদের মুক্তিবাহিনীর দল এই রাস্তাটিকে মুক্ত করেই ছাড়বে। মাহাবুব কোম্পানির ক’জন মুক্তিযোদ্ধা, ঠিক বিকেল গড়িয়ে সন্ধা হলো। ৩টি এন্টিপারসোনাল ১৬ ও ১০টি এন্টিপারসোনাল ১৪ মাইন নিয়ে রওনা দেন তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাস্তায় মাইন পুতে রাখবেন। ঠিক চৌরাঙ্গী হতে মাইন পোতা শুরু (বর্তমানে বালাপাড় ও চৌরাঙ্গীর শিসা তলি ঘাটের দিকে অগ্রসর হলেন) তখন রাত ঠিক ৮টা কিংবা ৯টা। মাইন পুতে রাখা প্রায় শেষ, ইতিমধ্যে খানসেনাদের টহল টিমের গাড়ি। গাড়ির শব্দ শোনার সাথে সাথে সব মুক্তিযোদ্ধা যে যার মত সরে গেলেন।

২০০ গজের মত দুরে যাওয়ার সাথে সাথে চারিদিকে বিকট শব্দে মাইন ফাটতে শুরু করে। আর মাইনের আক্রমনে সাথে সাথে পাক বাহিনীদের দলের ৪ সদস্য ঘটনাস্থানে মৃত্যু বরণ করে ৩ জন গুরুতর আহত হন। এর পর থেকে আর ভুলক্রমে সে রাস্তায় কখনও কোনো খান সেনা আসেনি। সেই থেকে বন্ধ হয় ঐ রাস্তা আর খান সেনার যোগাযোগ ব্যাবস্থা।

২৮শে অক্টোবর ১৯৭১ খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নরে টুনির হাটের যুদ্ধ: ঠিক সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, পরে ভোর ৪টা ৪০ মিনিট সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় ডিমলার টুনিরহাটে। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ৪টি কোম্পানি।মাহাবুব কোম্পানি, মনির কম্পানী, সিদ্দিক কোম্পানী ও রওশন কোম্পানী। পাকিস্তানীরা ভাড়ি অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের যোদ্ধাদের হাতে সামান্য কটি অস্ত্র-বেশ কটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এল,এম,জি, ২২টি, টুইন মটরস ৫টি, এন্টি পার্সোনাল ১৬/১৪ মাইন, এস এল আর ৫টিসহ আরও বেশ কটি অস্ত্র যে যার মত পজিশন নিয়েছে টুনির হাট মুক্ত করতেই হবে, হানাদারদের উৎখাত করতে সব প্রস্তুতি শেষ।

সময় শুধু সকালের অপেক্ষা ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে যুদ্ধ শুরু। চারটি কোম্পানীর প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ জনের মুক্তিযোদ্ধা। চোখে মুখে বিজয়ের নেশা সাথে সাধারণ মানুষ অনুপ্রেরণা। চলছে প্রচণ্ড গোলাগুলি। দুই দিক হতে শুধু গুলি আর গুলির আওয়াজ। ইতি মধ্যে আমাদের একজন যোদ্ধা রণাঙ্গনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার পেটের ভুড়ি বের হয়ে গেল। আহত বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ আরশাদ আলীর সহযোদ্ধারা তাকে কাধে করে নিয়ে গেলেন মুক্ত অঞ্চলে (বর্তমান আশাদগঞ্জে)। কিছুক্ষণ বেঁচে থাকার পর প্রচণ্ড যন্ত্রনায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন তিনি। পরে তাকে বর্তমানে আরশাদগঞ্জে বর্তমান সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আফতাব উদ্দিন সরকার ও উপজেলার চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা তবিবুল ইসলামসহ সকল সহযোদ্ধা সমাহীত করেন। বর্তমানে তার কবরটি সৃতি হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

সে সময়ে গুরুত্বর আহত অবস্থায় ধরা পড়েন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ শামছুল হক। তাকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে আসেন ডিমলা বাবুর হাটের রামডাংগা পুরান থানা ক্যাম্পে। হতাহত দুজনে মাহাবুব কোম্পানির যোদ্ধা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের পিছু হটার সময় টুনিরহাটের বেশ কটি গ্রামের ১২০টির মত ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেন। এই যুদ্ধে খান সেনাদের ৯ জন সদস্য নিহত হন ও আহত হন ৬ জনের মত। সেখান থেকে পিছু হটে খান সেনার চলে আসেন ডিমলার ক্যাম্পে, মুক্ত হয় টুনির হাট অঞ্চল।

আর পাকিস্তানী বাহিনী পিছু হটার সময় রনাঙ্গনে আহত যোদ্ধা শহীদ শামছুল হককে পা বেধে মাটির সাথে ছেচরিয়ে নিয়ে আসেন রামডাঙ্গা পূরান থানা ক্যাম্পে। সারারাত পাশবিক নির্যাতন, বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয় তাকেও। হত্যার পর তার লাশ ফেলে দেওয়া হয় পাশের জঙ্গলে। রামডাঙ্গা এলাকার বেশ ক’জন মানুষ ভয়ে ভয়ে কোনো রকম তাকে মাটি চাপা দিয়ে সমাহিত করেন। এখন তার কবরটি মাননীয় সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আফতাব উদ্দিন সরকার নিজের উদ্যোগে সংরক্ষণ করেছেন।

৬ই নভেম্বর ১৯৭১ সুটিবাড়িতে পাক বাহিনীর ক্যাম্প অপারেশন: প্রস্তুতি নিয়েছিলেন পরিকল্পনা মত যথাক্রমে মতিন কোম্পানী, হারেছ কোম্পানী ও রওশন কোম্পানী সহ তিন কোম্পানী মিলে পাক বাহিনীর টহল টিমের উপর গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমন শুরু করেন। অতর্কিত আক্রমনে পাক বাহিনীর দুই সদস্য আহত হয় এবং পাক বাহীনির দল যুদ্ধস্থল থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পালিয়ে যাবার সময় পাক হানাদাররা ১২০টি ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং বেশ কজন সাধারণ মানুষকে হত্যা করেন। সে দিন সুটিবাড়ি(বর্তমান গয়াবাড়ি ইউনিয়ন) এলাকা পাক হানাদার মুক্ত হয়। মৃত, সাধারণ মানুষদের সুটিবাড়ি বাজারের ভিতরে গণ কবর দেওয়া হয়। তাদের স্মৃতি সংরক্ষণে সেখানে বীরমুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকারের নিজ উদ্যোগে স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

১০শে ডিসেম্বর ১৯৭১ মাইন বিস্ফোরন: যুদ্ধ চলাকালীন সময় ডিমলায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনির চলাচলের বিভিন্ন রাস্তায় মুক্তিযোদ্ধার মাইন পুতে রাখেন। ডিমলা মুক্ত প্রায়। এবার পুতে রাখা মাইন তোলার পালা। বিভিন্ন স্থানে পুতে রাখা মাইনের আক্রমনে বেশ কটি কৃষকের গরুও মারা যায়। তাই মাইনগুলো তুলে নিস্ক্রিয় করতে হবে। মাইন তোলা নিস্ক্রিয় করার কাজ শুরু। চোখে মুখে যেমন বিজয়ে ডিমলা মুক্তির নেশা।

মুক্তিযোদ্ধারা পরিবারের কাছে ফিরে যাবে তাদের মন পরে আছে বাড়িতে, তারপরও সব মাইন তুলে জমা করতে হচ্ছে ক্যাম্পে (বর্তমান ঠাকুরগঞ্জ বাজারের পাশে বালাপাড়া বিওপি ক্যাম্পের সাথে ধউলুর বাড়ির পাশে) ছিলো মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প। সেখানে সব মাইন তুলে রাখা হলো। ক্যাম্পে যে যার মত একে অপরের কানে তাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার আভাস জানাচ্ছিলেন। চোখে মুখে এক আনন্দের কথা, দেশ স্বাধীন হবে।আর ক্যাম্পে ১০০/১৫০টি জমা রাখা মাইনগুলো তো নিস্ক্রীয় করতে হবে। মনির কোম্পানির টু আইসি সহ ৭ জন সদস্য ক্যাম্পে জমা রাখা মাইন নিস্ক্রীয়র কাজে ব্যস্ত। কে জানে ঘটবে এমন দূর্ঘটনা।

অসাবধানতার কারণে সেখানে একটি মাইন বিস্ফোরন হওয়ার সাথে সাথে বাকি মাইন গুলো ফাটতে শুরু হল। সেই দূর্ঘটনার ফলে ক্যাম্পে থাকা ৭ জন বীরযোদ্ধার প্রাণ দিতে হলো বিজয়ের পরও। কারো মাথা উরে গেলে ধান খেতে কারও পা উরে পরে আছে বাঁশ ঝাড়ে, কারও পেটের ভুড়ি বাশের আগায় কারও ক্ষতবিক্ষত হাত পা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যায় সেদিন। পরে ছড়িযে ছিটিয়ে থাকা শরীরের বিভিন্ন অংশ এক সাথে করে সমাহিত করা হয় এক সাথে সবাইকে। বর্তমানে সেখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর ও হিন্দু মুক্তিযোদ্ধার সমাহিত মন্দীর তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণের বিনিময় মুক্ত হয় ডিমলা। তাই ১১ই ডিসেম্বর ডিমলা মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

ঐ দিকে সারা দেশ ব্যাপি মুক্ত হতে থাকে বিভিন্ন অঞ্চল। ডিমলা মুক্ত করার পর আমাদের মুক্তিযোদ্ধার বিভিন্ন কোম্পানী এডভান্স করতে থাকে মূল ক্যাম্প নীলফামারী নটখানার দিকে। মাহাবুব কোম্পানী গোমনাতী হয়ে বোড়াগাড়ি ডোমার হয়ে নটখানায়। সিদ্দিক কোম্পানী ডিমলা সদর হয়ে শৈলার ঘাট দিয়ে নীলফামারি নটখানায়। মনির, রওশন, মতিন কোম্পানী সুটিবাড়ি, ডালিয়া, চাপানি, জলঢাকা, কৈমারি, কিশোরগঞ্জ হয়ে নটখানায়।সকল কোম্পানী নীলফামারী প্রধান ক্যাম্পে মিলিত হয়। এবং হারেছ কোম্পানি সরাসরি রংপুর ক্যাম্পে মিলিত হয়। এভাবেই ১৯৭১ সালের ১১ই ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় নীলফামারীর সীমান্ত ঘেষা ডিমলা(বর্তমানের ডিমলা উপজেলা)।

লেখক: মহিনুল ইসলাম সুজন (সাংবাদিক), সহযোগীতায়: আবু সায়েম সরকার (আহবায়ক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ডিমলা উপজেলা) বিডিটুডেস/এএনবি/ ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

2 × three =